অনলাইন ডেস্ক

দেশে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক কারবারি চক্র—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিরাপত্তা দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় নজরদারিতে সাময়িক ফাঁক তৈরি হচ্ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে মাদক প্রবাহ বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় জরিপ না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কারবারিদের তৎপরতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সীমান্ত এলাকা, মহাসড়ক এবং নদীপথসহ বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে দেশে মাদক প্রবেশের প্রবণতা বাড়ছে।
সর্বশেষ বুধবার ভোরে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০০ বোতল ফেনসিডিল, ৫০০ পিস নেশাজাতীয় ইনজেকশন, ২৫ বোতল বিদেশি মদ এবং ২৭ বোতল আমলকুল জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
এর আগে মঙ্গলবার কক্সবাজার থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীগামী একটি বিলাসবহুল বাস থেকে ১১ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়। একই দিনে রাজধানীর শ্যামপুর, মিরপুর, উত্তরা ও টঙ্গী এলাকায় পৃথক অভিযানে প্রায় ৭৮ হাজারের বেশি ইয়াবা উদ্ধার এবং একাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রোববার বগুড়ায় একটি বিলাসবহুল বাস থেকে দেড় হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, আটক ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সক্রিয় সদস্য এবং দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক সংগ্রহ করে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছিলেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক কর্মসূচি বৃদ্ধি, নগদ অর্থের লেনদেন বাড়া এবং মানসিক চাপের কারণে মাদকের চাহিদাও বেড়ে যায়। ফলে এই সময়টিকে কারবারিরা ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে নেয়।
মাদকবিরোধী সংগঠন ‘মানস’-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, নির্বাচনী ব্যস্ততা মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বা ছত্রচ্ছায়াও এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ মাদক ভারত ও মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। স্থল, নৌ ও রেলপথসহ দুর্গম সীমান্ত অঞ্চল ব্যবহার করে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), গাঁজা এবং বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক দেশে ঢুকছে।
ডিএনসি ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী ৩২ জেলায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন সময় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এ এম জাবের বিন জব্বার বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নির্বাচনী দায়িত্বের কারণে মাদকবিরোধী কার্যক্রম শিথিল হয়েছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। গোয়েন্দা নজরদারি, টার্গেটেড অভিযান এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকালীন সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা, কালো টাকার প্রবাহ এবং অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এই সময় মাদক ও অবৈধ অস্ত্র প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি জরুরি।


