ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। এ উত্তাপের কেন্দ্রে রয়েছেন সদ্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে মাঠে নামা, প্রতীক নিয়ে বিতর্ক এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত নেতাকর্মীদের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে আসনটি এখন আলোচনার শীর্ষে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের কুচনী গ্রামে নির্বাচনী পথসভায় রুমিন ফারহানা বলেন, গত ২৫ বছরে এই আসনে কোনো “ধানের শীষের” প্রার্থী ছিল না। তাঁর ভাষায়, “২৫ বছর ধরে নেতাকর্মীদের একটাই দাবি ছিল—দলের নিজস্ব প্রার্থী দেওয়া। কিন্তু তা না করে প্রার্থী ভাড়া করতে হয়েছে। সেই প্রার্থীর মার্কা খেজুর গাছ। এখন শুনতে হয় ধানই নাকি খেজুর গাছ। হাঁস যেমন বাঘ হয় না, তেমনি খেজুর গাছও ধান নয়। ধান হচ্ছে মানুষের প্রাণ।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্টতই বিএনপির নির্বাচনী কৌশল ও জোট রাজনীতির সমালোচনা করেন। উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি বিএনপি তাদের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। ফলে বিএনপির সমর্থনে এখানে প্রার্থী হচ্ছেন জমিয়তের সহসভাপতি মওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন রুমিন ফারহানা, যার জেরে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পথসভায় নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, গত ১৭ বছর তিনি শেখ হাসিনার মতো শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে “চোখে চোখ রেখে” কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, সেই সাহসী ভূমিকার কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে ভালোবাসে। “যখন বড় বড় নেতারা ফোন বন্ধ করে রেখেছিলেন, যখন নেতাকর্মীদের ধানক্ষেত আর বিলে রাত কাটাতে হয়েছে, তখন মানুষ আমাকে কথা বলতে দেখেছে। তখন তারা আশ্বস্ত হয়েছিল—কেউ না কেউ আছে, যে তাদের জন্য কথা বলবে,” বলেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রুমিন ফারহানার বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এটি বিএনপির তৃণমূলের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজ দলের প্রার্থী না পাওয়া এবং জোট রাজনীতিতে ‘ছাড় দেওয়া’ আসনগুলোতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এ অভিযোগ নতুন নয়। তবে একজন পরিচিত জাতীয় নেত্রীর প্রকাশ্য বিদ্রোহ সেই অসন্তোষকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্ট—দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং জোট প্রার্থীই দলীয় সমর্থন পাবেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, আসনটিতে নির্বাচন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে নয়, বরং প্রতীক, পরিচয় ও দলীয় আনুগত্যের প্রশ্নেও লড়াই হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের নির্বাচন এবার শুধু ভোটের হিসাব নয়; এটি বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব, জোট রাজনীতির সীমাবদ্ধতা এবং তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।


