মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

ঢাকা, ৮ জানুয়ারি ২০২৬ – বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান বা “স্প্রেড” গত কয়েক মাসে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯% সীমারোপ থাকার ব্যবস্থা ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রত্যাহার হওয়ার পর থেকে এই ব্যবধান দ্বিগুণের বেশি বেড়ে কিছু ব্যাংকে ৮%–১০% স্প্রেড লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নভেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর গড় আমানত সুদের হার ৬.৩৬%, আর ঋণের সুদের হার ১২.১৪%। ফলে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫.৭৮%। তবে ৮টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে স্প্রেড ৮%–১০%-এর বেশি এবং আরও ১৪টির ক্ষেত্রে ৬%–৮%। তুলনায়, স্প্রেডের ওপর আরোপিত সীমা প্রত্যাহারের আগের বছর একই সময়ে গড় স্প্রেড ছিল মাত্র ৩.৩৫%।
উচ্চ স্প্রেডের কারণ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্প্রেডের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুধু সুদের হার মুক্ত করা নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং ঝুঁকি নিতে ব্যাংকগুলোর অনীহার ফল। ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা ১০%-এর বেশি অর্জন করায় শিল্প ও বাণিজ্যে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “উচ্চ স্প্রেড বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়িয়ে গেলে ঋণের সুদের হার আরও বাড়তে পারে, যা ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ তৈরি করবে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যোগ করেন, “বাজারভিত্তিক সুদের হারের মানে তদারকির অভাব নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি দ্রুত কমানো না হলে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নেবে। স্প্রেড দীর্ঘমেয়াদে ৬%-৭% এর ওপরে থাকলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”
বিনিয়োগ ও এলসিতে প্রভাব
উচ্চ ঋণ সুদের হারের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনেক পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। এছাড়া আমদানির খরচ বৃদ্ধির কারণে এলসি খোলার পরিমাণও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই–নভেম্বর সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা ৩২.২২% বেড়েছে, কিন্তু এলসির নিষ্পত্তির হার ১৬.৭৭% কমে গেছে। মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা ১.৯৫% বেড়েছে, নিষ্পত্তির হার ১৬.৪১% কমেছে। কাঁচামালের ক্ষেত্রে সামান্য বৃদ্ধি ০.৪৫%।
ফলস্বরূপ, টানা ছয় মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭% এর নিচে আটকে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি ৬.৫৮%-এ নেমে গেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্য থেকেও কম।
ব্যাংকিং খাতে উদারীকরণ ও নীতিগত নির্দেশনা
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ঋণের সুদের হার ৯% সীমার মধ্যে রাখা হয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে “সিক্স-মান্থ মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল (SMART)” চালু এবং নভেম্বরে স্প্রেডের ওপর ৪% সীমা প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৪ সালের ৮ মে ঋণের সুদের হার সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জানান, ব্যাংকগুলো অতিরিক্তভাবে স্প্রেড বাড়িয়েছে, ফলে ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বৈঠকে বলেন, “স্প্রেড সহনীয় পর্যায়ে নামানোর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আপাতত নৈতিক চাপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে স্প্রেড কমাতে বলা হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করতে হবে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঋণ মান উন্নত করতে হবে। নীতিগত তদারকি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ ও আমানতের সুদের হারের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তা না হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত থাকবে এবং অর্থনীতির গতিশীলতা ধীর হবে।
উচ্চ ঋণ–আমানত স্প্রেড ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। শিল্প ও উৎপাদনে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
মোঃ খুরশীদ আলম সরকার
দপ্তর সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


