নিজস্ব প্রতিবেদক ও সাভার প্রতিনিধি

মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং তরুণ প্রজন্মের নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্যদিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে মহান বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকী। ১৯৭১ সালে যাঁদের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি শাসন-শোষণের অবসান ঘটেছিল এবং বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় হয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের—সেই বীর সন্তানদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করেছে পুরো জাতি।
১৬ ডিসেম্বর ভোরের প্রথম প্রহরে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির পক্ষ থেকে শহীদদের অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদসহ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা, তিন বাহিনীর প্রধানেরা শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিসহ সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জনস্রোতে স্মৃতিসৌধ, কণ্ঠে দেশাত্মবোধ
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাধারণ মানুষের জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে সেখানে নামে সর্বস্তরের মানুষের ঢল। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, যুব সংগঠন, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল রঙিন ফুল, কণ্ঠে দেশগানের সুর। সেই সুরে সুর মিলিয়ে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর শ্রদ্ধা ও প্রত্যাশা
স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান বিএনপির শীর্ষ নেতারা—স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমদসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে দলটির নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জাসদ, বাসদ, সিপিবি, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি সম্মান জানায়। ডাকসুর পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
ভিন্ন বাস্তবতায় এবারের বিজয়
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন এবং পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচারে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রেক্ষাপটে এবারের বিজয় দিবস পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। জাতির প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত ও নির্যাতন-নিপীড়নহীন বাংলাদেশ গঠনের দাবি বিজয় দিবসের কর্মসূচিতে ছিল উচ্চকিত। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান উঠে আসে বিভিন্ন শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা থেকে।
সারা দেশে উদ্যাপন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের নেতৃত্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্মৃতিসৌধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারা দেশে কর্মসূচি পালন করে।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি-বেসরকারি ভবনে উত্তোলিত হয় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। সড়ক, সড়কদ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সাজানো হয় ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায়। যানবাহন ও মানুষের হাতে শোভা পায় ছোট ছোট পতাকা। সরকারি ছুটির দিনে দেশজুড়ে বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়।
প্রার্থনা ও অঙ্গীকার
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের সব মসজিদে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি এবারের বিজয় দিবস জাতিকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে—মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, এটি একটি চলমান দায়বদ্ধতা। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে জাতি।


