নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ব্যাংক রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ অনুযায়ী দেশের আর্থিক খাতের ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ (লিকুইডেশন) করার অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড। বোর্ডের এই অনুমোদনের ফলে এখন এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ, লিকুইডেটর নিয়োগ, সম্পদ বিক্রি এবং পাওনাদারদের মধ্যে অর্থ বণ্টনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।
রবিবার গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডসভায় সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় উপস্থিত ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে
মোট ৯টি দুর্দশাগ্রস্ত ও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানকে লিকুইডেশনের তালিকায় রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
-
এফএএস ফাইন্যান্স
-
বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)
-
প্রিমিয়ার লিজিং
-
ফারইস্ট ফাইন্যান্স
-
জিএসপি ফাইন্যান্স
-
প্রাইম ফাইন্যান্স
-
আভিভা ফাইন্যান্স
-
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস
-
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল)
কেন বন্ধ হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে—
-
বিভিন্ন অনিয়ম
-
দুর্বল পরিচালনব্যবস্থা
-
ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাৎ
-
তারল্য ঘাটতি ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতা
-
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়া
—এসবের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বারবার এসব প্রতিষ্ঠানে গভীর সংকটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এরপর ২০২৫ সালের নতুন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাতকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে চূড়ান্ত লিকুইডেশনের পথে হাঁটল।
লিকুইডেশন প্রক্রিয়ায় কী হবে
বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ায় এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নিম্নলিখিত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করবে—
১. লিকুইডেটর নিয়োগ
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক লিকুইডেটর নিয়োগ করা হবে, যারা সম্পূর্ণ লিকুইডেশন প্রক্রিয়া তদারকি করবেন।
২. সম্পদ মূল্যায়ন ও বিক্রি
প্রতিষ্ঠানগুলোর—
-
ঋণপোর্টফোলিও
-
স্থাবর সম্পত্তি
-
বিনিয়োগ
-
অন্যান্য আর্থিক সম্পদ
—মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে বিক্রি করা হবে।
৩. পাওনাদারদের অর্থ বণ্টন
প্রাপ্ত অর্থ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বণ্টন করা হবে—
-
সরকারি পাওনা
-
আমানতকারী ও ঋণদাতাদের দাবি
-
অন্যান্য আইনগত পাওনাদার
৪. প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ
সব অফিস ও কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লিকুইডেশনের মাধ্যমে—
-
খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
-
অনিয়ম রোধ
-
আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার
-
দুর্বল ও অচল প্রতিষ্ঠানের বোঝা কমানো
—এগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ খাতের শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে লিকুইডেশন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হলে আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, দ্রুত ও আইনগত বিধান অনুযায়ী বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


