বিশেষ প্রতিবেদন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ তিন সপ্তাহ পেরিয়ে এক জটিল ও অনির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর প্রকাশ্য বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল নতুন করে প্রশ্ন তুলছে সংঘাতের প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে।
বক্তব্যে ‘শেষের পথে’, বাস্তবে বিস্তৃত অভিযান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ “প্রায় শেষ হয়ে এসেছে” এবং পরিস্থিতি “শান্ত হয়ে আসছে”। তবে একই সময়ে ইরানের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরদিকে, মার্কিন মেরিন ইউনিটসহ স্থল বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের খবর ইঙ্গিত দিচ্ছে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনার দিকে।
হরমুজ প্রণালি: কৌশল না জটিল বাস্তবতা
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পথ Strait of Hormuz খুলে দেওয়াকে ট্রাম্প “সহজ সামরিক কৌশল” হিসেবে উল্লেখ করলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন।
বর্তমানে কেবল ইরানের অনুমোদিত জাহাজই এই জলপথ ব্যবহার করতে পারছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
ইরানি সক্ষমতা ‘ধ্বংস’—তবু হামলা অব্যাহত
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ হলেও, দেশটির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই হামলার বিস্তার ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন-যুক্তরাজ্য ঘাঁটি Diego Garcia পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন হুমকি: বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালাবে।
এতে সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লক্ষ্য বদলাচ্ছে? শাসন পরিবর্তনের প্রসঙ্গ অনুপস্থিত
যুদ্ধের শুরুতে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ও “শর্তহীন আত্মসমর্পণ” নিয়ে জোর দিলেও, সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।
বর্তমান কৌশল অনুযায়ী, ইরানের বিদ্যমান সরকার বহাল রেখেই তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্থল অভিযানের সম্ভাবনা ও খার্গ দ্বীপ ফ্যাক্টর
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে Kharg Island—ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র।
এই দ্বীপ দখল করা গেলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় আঘাত আসতে পারে এবং তেহরানকে আলোচনায় বাধ্য করার কৌশল হিসেবে এটি বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপের জবাবে ইরান ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়েছে, লোহিত সাগরসহ আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোকে “অনিরাপদ” করে তোলার।
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ইঙ্গিত: ২০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল
মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কংগ্রেসে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই পদক্ষেপ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরালো করছে।
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য Chip Roy বলেছেন,
“আমরা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পাঠানোর কথা বলছি। দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রমের ব্যয় ও লক্ষ্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।”
সন্ধিক্ষণে ইরান যুদ্ধ
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘাতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে সীমিত লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত সমাপ্তির প্রচেষ্টা, অন্যদিকে স্থল অভিযান ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল—দুই সম্ভাবনাই খোলা রয়েছে।
যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট যে, এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে।


