বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত ক্রমেই এক গভীর আস্থার সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা এখনো অধরা। ফলে প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার আশায় লক্ষাধিক মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, যার কারণে দেশ থেকে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারতে যান, যা ভারতের মোট মেডিকেল ট্যুরিস্টের প্রায় ৫২ শতাংশ। রোগীদের মতে, বিদেশে যাওয়ার মূল কারণ চিকিৎসার অভাব নয়; বরং রোগ নির্ণয়ে আস্থার ঘাটতি, অপ্রত্যাশিত বিল, গোপন খরচ, নিম্নমানের ওষুধের আশঙ্কা এবং হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা।
বাজেট বাস্তবতা
২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩১,০২২ কোটি টাকা। যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি, তবুও মোট বাজেটের মাত্র ৩.৯৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জিডিপির মাত্র ০.৬৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হওয়ায় রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা কাক্সিক্ষত সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না—যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বনিম্ন।
শয্যা ও জনবল: ভয়াবহ ঘাটতি
বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে হাসপাতালের শয্যা মাত্র ০.৮৮টি, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড তিনটি। একই সঙ্গে—
- প্রতি ৮৩০ জনে একজন চিকিৎসক
- প্রতি ১১,৫৩১ জনে একজন ডেন্টিস্ট
- প্রতি ৫৬,৫৯৯ জনে একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থা নার্স ও টেকনোলজিস্টের ক্ষেত্রে। প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে নার্সের সংখ্যা ছয়জনেরও কম, যেখানে মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন ৭০ জন।
ঢাকাকেন্দ্রিক বৈষম্য
দেশের ৫৩ শতাংশ বিশেষায়িত হাসপাতাল ঢাকা বিভাগে অবস্থিত, অথচ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। ঢাকার বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
চিকিৎসা ব্যয়: রোগীর পকেটেই চাপ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৩–৭৪ শতাংশই রোগীদের নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। স্বাস্থ্যবিমার আওতায় রয়েছে মাত্র ২.৫ শতাংশ মানুষ। ফলে একটি গুরুতর অসুস্থতা অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের চক্রে ঠেলে দিচ্ছে। তুলনায় জাপানে আউট-অব-পকেট ব্যয় মাত্র ১১ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৩০ শতাংশ—তাও কঠোর নিয়ন্ত্রণে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে কিছু অর্জন থাকলেও সামগ্রিকভাবে কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করা যায়নি। উন্নত দেশ তো বটেই, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, সরকারকে এই খাতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, আস্থা ফেরাতে জরুরি—
- স্বাস্থ্য বাজেট ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা
- চিকিৎসাসেবার মূল্য নির্ধারণ ও বিলিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
- স্বাধীন মান নিয়ন্ত্রণ ও অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষ
- স্বল্পমূল্যের সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা চালু
- ঢাকার বাইরে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বে অবকাঠামো উন্নয়ন
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কেবল বাজার সম্প্রসারণ নয়—নৈতিকতা, জবাবদিহি ও আস্থাই হতে হবে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের মূল ভিত্তি। অন্যথায় উন্নয়নের পরিসংখ্যান বাড়লেও সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে না।


