ইব্রাহিম খলিল বাদল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আগামী ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা সাত দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, ভোটের চার দিন আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরের দুই দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকবে। নির্বাচনি এলাকায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, এপিবিএন, কোস্টগার্ডের পাশাপাশি ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীও মোতায়েন থাকবে। উপকূলীয় এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে কোস্টগার্ড।
বিপুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি। সারা দেশে প্রায় ৪২ হাজার ৭৬৬টি ভোট কেন্দ্র এবং প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ভোটকক্ষ থাকবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ১৩ থেকে ১৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
মোট ৭ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নির্বাচনকালীন দায়িত্বে থাকবেন। এর মধ্যে আনসার-ভিডিপি সদস্য থাকবেন সাড়ে ৫ লাখের মতো, আর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি।
আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল ও ৯৯৯ বিশেষ টিম
নির্বাচন ঘিরে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে পুলিশ, আনসার, সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি থাকবেন।
এ ছাড়া নির্বাচনকালীন জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ৯৯৯ নম্বরে বিশেষ টিম গঠন করে তা সমন্বয় সেলের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ বা তথ্য পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে এই টিম সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সমন্বয় সেলের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেছেন। ফলে বর্তমানে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪২ জন।
তবে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ইসিতে আপিল করেছেন ২৯৫ জন প্রার্থী। আপিল গ্রহণের তৃতীয় দিনে জমা পড়েছে ১৩১টি আবেদন। অঞ্চলভিত্তিকভাবে সবচেয়ে বেশি আবেদন এসেছে ঢাকা অঞ্চল থেকে।
তফসিল অনুযায়ী—
-
৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল গ্রহণ
-
১০–১৮ জানুয়ারি আপিল নিষ্পত্তি
-
২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন
-
২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ও প্রতীক বরাদ্দ
-
২২ জানুয়ারি নির্বাচনি প্রচারণা শুরু
-
১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রচার চলবে
-
১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ
আচরণবিধি লঙ্ঘন ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ভোটের আর মাত্র ৩৫ দিন বাকি থাকলেও এরই মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগে সরগরম রাজনীতি। আগাম প্রচারণার অভিযোগও উঠেছে একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে জরিমানাও করা হয়েছে।
বিদেশি পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক নজর
নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে ২৬টি দেশ ও ৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার মোট ৮৩ জন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ
এরই মধ্যে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রীতার বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত নালিশ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আতাউর রহমান আতা। অভিযোগটি বর্তমানে ইসির বিবেচনায় রয়েছে।
একসঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট
এবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে, ফলে ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপার পাবেন। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং। দেশে ও প্রবাসে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই জমে উঠবে নির্বাচনি মাঠ। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আচরণবিধি প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কতটা গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হয়—সেদিকেই তাকিয়ে দেশবাসী।


