বিশেষ প্রতিবেদন

হাত-পা বেঁধে মাটিতে ফেলে একজনকে পেটানো হচ্ছে। চারপাশে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছেন সেই দৃশ্য। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছেন। কোথাও আবার কয়েকজন মিলে লাঠি ও ইট দিয়ে একজনকে বেধড়ক মারধর করছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় ক্ষমা চাওয়ার পরও থামছে না নির্যাতন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িঘরেও হামলার ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এমন একাধিক ভিডিও জনমনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—অপরাধ দমনের নামে আইন কি এখন সাধারণ মানুষ নিজেরাই হাতে তুলে নিচ্ছেন?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফরিদপুর জেলার অন্তত তিনটি আলোচিত ঘটনার সঙ্গে মাদক ব্যবসা বা মাদক সেবনের অভিযোগ জড়িত। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে আইনি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতেই বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার অধিকার সাধারণ মানুষের নেই।
ক্ষোভের পেছনে যে বাস্তবতা
বাংলাদেশে মাদক একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক সমস্যা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, সেবন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয় অথবা অভিযানের পরও অভিযুক্তরা দ্রুত এলাকায় ফিরে আসে।
ফলে কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই হতাশা থেকেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনতা নিজেরাই ‘বিচারক’ ও ‘শাস্তিদাতা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জনরোষের ভিত্তিতে দেওয়া শাস্তি কখনোই আইনের বিকল্প হতে পারে না।
আইন কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল আদালতের। কাউকে অপরাধী সন্দেহ করা যেতে পারে, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া তাকে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।
আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবসা বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকলেও তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা যেতে পারে। কিন্তু মারধর, নির্যাতন বা সম্পত্তিতে হামলা করার কোনো বৈধতা নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, “আমরা তো জঙ্গলে বসবাস করছি না। কেউ অপরাধী হলে তার বিচারের জন্য দেশে আইন আছে, আদালত আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই।”
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, গণপিটুনি বা জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা হতে পারে।
জনতার বিচার কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জনতার বিচারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এখানে সত্যতা যাচাইয়ের কোনো নিরপেক্ষ ব্যবস্থা থাকে না।
কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধী কি না, অভিযোগটি সত্য কি না, তার বিরুদ্ধে প্রমাণ কতটা শক্তিশালী—এসব কিছুই যাচাই না করেই অনেক সময় শাস্তি কার্যকর করা হয়।
ফলে নিরপরাধ কেউও জনরোষের শিকার হতে পারেন। অতীতে দেশে চোর সন্দেহে, শিশু চোরের গুজবে কিংবা বিভিন্ন অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারানোর বহু ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যখন জনতা বিচার করতে শুরু করে, তখন আইনের শাসনের জায়গা সংকুচিত হয় এবং সমাজে ভয় ও অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এসব নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও ধারণ ও প্রচারের এই প্রবণতা কখনো কখনো জনতার বিচারের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। কারণ এতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপমান করার পাশাপাশি ঘটনাকে ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়।
তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন হলেও সেটি অবশ্যই আইনের সীমারেখার মধ্যে হতে হবে।
পুলিশের অবস্থান
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এ ধরনের গণপিটুনি বা বেআইনি শাস্তির ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত বলে সন্দেহ হলে স্থানীয়দের উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা।
আইনের শাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, মাদকবিরোধী জনঅসন্তোষ একটি বাস্তবতা হলেও তার সমাধান বিচারবহির্ভূত শাস্তি নয়। বরং দ্রুত ও কার্যকর বিচার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা এবং অপরাধ দমনে দৃশ্যমান সাফল্যই মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
তারা মনে করেন, যখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়, তখনই জনতার বিচারের মতো প্রবণতা মাথাচাড়া দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজ ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।
কারণ আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো—অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, বিচার হবে আদালতে; শাস্তি দেবে রাষ্ট্র, জনতা নয়।


