অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন সামরিক নীতিতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’সহ কয়েকটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নীতি থেকে সরে এসে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু উচ্চ-তীব্রতার হামলার কৌশল গ্রহণ করছে।
২০২৬ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এখন এমন একটি মডেল অনুসরণ করছে যার লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তন করা—ভূখণ্ড দখল করা বা দীর্ঘদিন ধরে কোনো দেশ শাসনের দায়িত্ব নেওয়া নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলকে অনেকেই “ট্রাম্প ডক্ট্রিন” নামে অভিহিত করছেন। এর মূল দর্শন হলো, দ্রুত ও শক্তিশালী সামরিক আঘাতের মাধ্যমে শত্রু রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে তারা মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে।
সম্প্রতি ইরান ও ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র যে নির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে, তা এই নীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। এসব অভিযানে পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং নেতৃত্বদানকারী কমান্ড সেন্টারকে টার্গেট করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. অ্যান্ড্রু ল্যাথাম মনে করেন, এই পরিবর্তন মূলত উত্তর-শীতল যুদ্ধ পরবর্তী মার্কিন কৌশলের একটি নতুন অধ্যায়। তার মতে, আগের “পাওয়েল ডক্ট্রিন”-এ যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট রাখা এবং একটি পরিষ্কার সমাপ্তির পরিকল্পনা করার ওপর জোর দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান কৌশল আরও আক্রমণাত্মক এবং দ্রুত ফলাফলমুখী।
তার ভাষায়, “এখন লক্ষ্য শুধু বিজয় নয়; বরং প্রতিপক্ষের সক্ষমতাকে এমনভাবে ধ্বংস করা যাতে তারা ভবিষ্যতে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে না পারে।”
ইরানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানকে এই নতুন নীতির একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন বিমান বাহিনী ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক কমান্ড নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট হামলা চালাচ্ছে। তবে এসব অভিযানের পাশাপাশি সেখানে স্থলবাহিনী পাঠিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্বের কোনো পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই বলে জানা গেছে।
একই ধরনের কৌশল বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত অভিযানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। সেখানে দ্রুতগতির সামরিক পদক্ষেপে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার পর মার্কিন বাহিনী অভিযান শেষ করে সরে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির চাপও কাজ করছে। বর্তমানে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই বহুমুখী প্রতিযোগিতার দিকে যাচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রিসিশন স্ট্রাইকের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূর থেকেই শত্রু রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা ধ্বংস করার কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই নীতির কিছু বড় ঝুঁকিও রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কৌশলগত জবরদস্তি সবসময় স্থিতিশীল রাজনৈতিক ফলাফল বয়ে আনে না। হামলা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশে ক্ষমতার শূন্যতা বা অরাজকতা তৈরি হলে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
এর ফলে ভবিষ্যতে নতুন সংঘাত বা অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ


