সুফি সাগর সামস্

একটি হত্যাকাণ্ড কখনো কখনো শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না—তা রাষ্ট্র, সমাজ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভঙ্গুর ভিত্তিকেও উন্মোচিত করে দেয়। ময়মনসিংহে ২৭ বছর বয়সী হিন্দু যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঠিক তেমনই এক বিস্ফোরক মুহূর্ত তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডটি এমন এক সময় ঘটেছে, যখন বাংলাদেশ নিজেই একাধিক স্তরের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকে কেন্দ্র করে সহিংস বিক্ষোভ, অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত নিয়ন্ত্রণ, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় উগ্রতার চাপ। এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উসকানি—যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।
একটি হত্যাকাণ্ড, বহু বয়ান
দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডটি নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গণপিটুনির মাধ্যমে তাকে হত্যা করা শুধু আইনহীনতার চরম উদাহরণ নয়, বরং বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এই ক্ষোভকে সীমান্ত ছাড়িয়ে ভারতে নিয়ে গেছে, যেখানে তা দ্রুত রাজনৈতিক রঙ ধারণ করেছে।
ভারতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তার একটি বড় অংশ মানবিক উদ্বেগের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে অতিরঞ্জিত করে ‘সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার বয়ান তৈরি করা হচ্ছে—যা দিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলে চাপ তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের ভেতরে ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিচ্ছে।
ভারতবিরোধিতা: রাজনৈতিক অস্ত্র না সামাজিক প্রতিক্রিয়া?
বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব নতুন নয়। তবে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তার পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং তাকে ফেরত না পাঠানোর বিষয়টি এই মনোভাবকে আরও তীব্র করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভারতপন্থি’ তকমা হয়ে উঠেছে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্ত্র—যার মাধ্যমে সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি মানবাধিকারকর্মীদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
এই প্রবণতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে সামাজিক বৈধতা দিচ্ছে। সুফি মাজার ভাঙচুর, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নারীদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা—এসব ঘটনা দেখাচ্ছে যে উগ্র অংশটি এখন নিজেকে মূলধারার প্রতিনিধি ভাবতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র যখন দৃশ্যমানভাবে কঠোর হতে ব্যর্থ হয়, তখন সহিংসতার জন্য এক ধরনের ‘সবুজ সংকেত’ তৈরি হয়।
কূটনৈতিক আস্থার ভাঙন
দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন—ভিসা সেবা স্থগিত, কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, হাইকমিশনার তলব—এসবই আস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, এমন পারস্পরিক অবিশ্বাস অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।
এখানে উভয় পক্ষই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতি অনুযায়ী কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। আবার একই সঙ্গে, প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের কঠিন পরীক্ষা
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ—এই দুই চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামাল দেওয়া সহজ নয়। তবে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও গণপিটুনি রোধে দৃশ্যমান কঠোরতা দেখাতে ব্যর্থ হলে সরকারের বৈধতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।
একটি নির্বাচিত সরকারই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও পররাষ্ট্র নীতির ভারসাম্য রক্ষা করতে বেশি সক্ষম। কিন্তু নির্বাচন পর্যন্ত সময়টাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ—যেখানে উসকানি, গুজব ও সহিংসতা পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
শেষ কথা: সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা?
এই উত্তেজনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ভারত বা কোনো রাজনৈতিক দল নয়—ভুক্তভোগী বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ, মধ্যপন্থি সমাজ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসীরা। ‘ভারতবিরোধিতা’ বা ‘ভারতপন্থা’র সরল দ্বন্দ্বে আটকে পড়ে সমাজের বহুত্ববাদী চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশই জানে, তারা ভূগোল, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার দিক থেকে পরস্পর নির্ভরশীল। সম্পর্ক যদি রাজপথের ক্ষোভ ও উগ্র বয়ানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তার মূল্য দিতে হবে উভয় দেশের জনগণকেই।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো—সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বাস্তববাদী সংলাপ। নইলে একটি হত্যাকাণ্ড যে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকটের জন্ম দিতে পারে—তার নজির হয়তো আমরা খুব কাছ থেকেই দেখতে যাচ্ছি।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


