অনলাইন ডেস্ক

এক সময় বিশ্ব বক্স অফিস মানেই ছিল হলিউডের একচ্ছত্র আধিপত্য। সুপারহিরো, ফ্র্যাঞ্চাইজি আর বিশাল বাজেটের সিনেমাই নির্ধারণ করত বছরের শীর্ষ আয়। তবে ২০২৫ সাল এসে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল। বিদায়ি বছরে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাটি আর হলিউডের নয়—ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি আর ভিন্ন দেশের একটি ছবি উঠে এসেছে বক্স অফিসের শীর্ষে। এই পরিবর্তন কেবল একটি সিনেমার সাফল্য নয়; বরং বদলে যাওয়া দর্শক রুচি ও বৈশ্বিক বাজারের নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন।
চীনা সিনেমার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
২০২৫ সালের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মান্দারিন ভাষার অ্যানিমেশন সিনেমা ‘নে ঝা ২’। বছরজুড়ে একের পর এক আয়ের রেকর্ড ভেঙে শেষ পর্যন্ত এটি বিশ্ব বক্স অফিসের শীর্ষস্থান ধরে রাখে। প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করে সিনেমাটি চীনা সিনেমার ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। আইএমডিবিতে ৮ রেটিং পাওয়া এই সিনেমা প্রমাণ করে—স্থানীয় গল্প হলেও বৈশ্বিক আবেগ ছুঁতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজার জয় সম্ভব।
অ্যানিমেশনের দাপট অব্যাহত
বিশ্ব বক্স অফিসের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘জুটোপিয়া ২’। ২০১৬ সালের জনপ্রিয় অ্যানিমেশনের এই সিকুয়েল মুক্তির পর থেকেই দর্শকপ্রিয়তায় এগিয়ে ছিল। জুডি হপস ও নিক ওয়াইল্ডকে ঘিরে গড়ে ওঠা গল্পে বৈষম্য, ক্ষমতা ও নৈতিকতার মতো বিষয় আরও পরিণতভাবে উঠে এসেছে, যা সব বয়সী দর্শকের মন ছুঁয়েছে।
তৃতীয় স্থানে থাকা ‘লিও অ্যান্ড স্টিচ’ আবেগঘন গল্পে দর্শকদের হৃদয় জয় করেছে। এক হাওয়াইয়ান মেয়ের সঙ্গে এক ভিনগ্রহের প্রাণীর বন্ধুত্ব ও ভাঙা পরিবারকে জোড়া লাগানোর গল্প নিয়ে তৈরি এই ডিজনি সিনেমাটি আয় করেছে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মাত্র ১০ কোটি ডলার বাজেটের বিপরীতে ১০৩ দশমিক ৮ কোটি ডলার আয় সিনেমাটিকে বছরের অন্যতম সফল প্রজেক্টে পরিণত করেছে।
গেম থেকে সিনেমা, সফল অভিযাত্রা
চতুর্থ স্থানে রয়েছে ‘আ মাইনক্র্যাফট মুভি’। জনপ্রিয় ভিডিও গেম অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমাটি অ্যাডভেঞ্চার, বন্ধুত্ব ও সৃষ্টিশীলতার গল্প তুলে ধরে পারিবারিক দর্শক থেকে শুরু করে গেমপ্রেমীদের মন জয় করতে সক্ষম হয়। এর মোট আয় ৯৫ দশমিক ৮ কোটি ডলার।
পঞ্চম স্থানে থাকা ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: রিবার্থ’ বিলিয়ন ডলারের ঘর স্পর্শ না করলেও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরের জগৎ, মানুষের লোভ ও বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রকৃতির সংঘাতের গল্প নতুনভাবে উপস্থাপন করে সিনেমাটি আয় করেছে ৮৬ দশমিক ৯ কোটি ডলার।
অ্যানিমে ও ফ্র্যাঞ্চাইজির শক্ত অবস্থান
ষষ্ঠ স্থানে থাকা জাপানি অ্যানিমে ‘ডেমন স্লেয়ার: ইনফিনিটি ক্যাসল’ আয় করেছে ৭১ দশমিক ৫ কোটি ডলার। আইএমডিবিতে ৮ দশমিক ৫ রেটিং পাওয়া এই সিনেমা অ্যানিমে দর্শকদের পাশাপাশি মূলধারার দর্শকদেরও টেনেছে।
সপ্তম স্থানে ‘হাউ টু ট্রেইন ইয়োর ড্রাগন’ আবারও প্রমাণ করেছে ড্রাগন ও মানুষের বন্ধুত্বের গল্পের আবেদন এখনো অটুট। সিনেমাটির আয় ৬৩ দশমিক ৬ কোটি ডলার।
অষ্টম স্থানে রয়েছে ‘এফ ওয়ান: দ্য মুভি’। ফর্মুলা ওয়ান রেসিংকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সিনেমাটি প্রতিযোগিতা, টিমওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্পে দর্শকদের আকৃষ্ট করে আয় করেছে ৬৩ কোটি ডলার।
সুপারহিরো ও স্পাই থ্রিলারের উপস্থিতি
নবম স্থানে থাকা ‘সুপারম্যান’ সিনেমাটি সুপারহিরোর মানবিক ও নৈতিক দিক তুলে ধরে দর্শকের মন জয় করেছে। আইএমডিবি রেটিং ৭ দশমিক ১।
তালিকার দশম স্থানে রয়েছে ‘মিশন ইম্পসিবল: দ্য ফাইনাল রেকনিং’। ইথান হান্টের শেষ অভিযান হিসেবে পরিচিত এই সিনেমাটি ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট ও নাটকীয়তায় ভর করে আয় করেছে ৬১ দশমিক ৬ কোটি ডলার।
বদলে যাওয়া দর্শক, বদলে যাওয়া বাজার
২০২৫ সালের বক্স অফিস তালিকা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়—বিশ্ব সিনেমা এখন আর কেবল হলিউডকেন্দ্রিক নয়। চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা বৈশ্বিক বাজারে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অ্যানিমেশন, অ্যানিমে ও পারিবারিক গল্পের প্রতি দর্শকের ঝোঁক বাড়ছে। ভাষা ও দেশের সীমানা পেরিয়ে গল্পই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি—আর সেই গল্পই নির্ধারণ করছে বিশ্ব বক্স অফিসের নতুন রাজা।


