সুফি সাগর সামস্

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সংবিধান বলতে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে প্রণীত আইন ও বিধি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা শাসিত হওয়ার সময়কালে তৈরি হয়েছিল।
এই সংবিধানিক কাঠামোতে বেশ কিছু আইন ও অধ্যাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ব্রিটিশদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে সুসংহত করতে সহায়ক ছিল। বাহাত্তরের সংবিধানেও ব্রিটিশ শাসকদের মত বাংলাদেশের শাসকদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে সুসংহত রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে শোষণমূলক অনেক বিধি-বিধান চালু করা হয়েছিল, যেগুলির লক্ষ্য ছিল মূলত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং ভারতীয় সম্পদ শোষণ করা। বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের সময় বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র থাকাসত্বেও, অনেক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের আইন ও বিধি বাতিল করা হয়নি—বরং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২ এর মাধ্যমে “বিদ্যমান আইন” হিসেবে কার্যকর রাখা হয়েছিল। এগুলোর বেশিরভাগই ছিল ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত শোষণমূলক আইন, যা প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে ঔপনিবেশিক ধাঁচ বজায় রেখেছিল।
১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। এই স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে পূর্বের সরকারের সংবিধান ও সকল মালিকানা সত্ত্বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছিল। সকল ভূমি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি সমগ্র নাগরিকদের সমান মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আইন পুনর্বহাল করে বাহাত্তরের সংবিধানের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনামলের জমিদারদের জমিদারি, জোৎদাদের জোৎদারি এবং শিল্পপতিদের শিল্পকারখানা ফিরিয়ে দিয়ে দেশের মালিকদের তাদের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
এ কারণে দেশের ৯০ ভাগ মানুষ এখনো পর্যন্ত ১০ ভাগ মানুষের গোলামী করছে। যৌক্তিক ছিল, ব্রিটিশ আমলের সিএস এবং পাকিস্তান আমলের এসএ পর্চা বাতিল করে সমগ্র দেশের সমগ্র ভূমিসম্পদ সকল নাগরিকদের মধ্যে মাথাপিছু সমান হারে বন্টন করে দিয়ে বিএস পর্চা তৈরি করে জনগণের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া।
এটা করা হলে, দেশের ৬ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হত। জনগণ নিজে থেকে সাবলম্বী হতে পারত। বর্তমান সময়ে গরীব মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণমূলক যে আইন ১৯৭২ সালের সংবিধানে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বহাল রাখা হয়েছিল তা হলো :
১. ফৌজদারি ও দণ্ডবিধি সম্পর্কিত আইন :
ক) Penal Code, 1860 — ব্রিটিশ ভারতে অপরাধ সংজ্ঞায়িত ও দণ্ড নির্ধারণের জন্য প্রণীত হয়েছিল; এর বহু ধারা দমনমূলক। যেমন, রাষ্ট্রদ্রোহ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন ইত্যাদি।
খ) Criminal Procedure Code, 1898 (CrPC) — পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার হাতিয়ার।
গ) Evidence Act, 1872 — সাক্ষ্য ও প্রমাণের ক্ষেত্রে উপনিবেশিক আদালতের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বজায় রাখে।
এসব আইন শাসকদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে সুসংহত এবং স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী করে তোলে।
২. প্রশাসনিক ও পুলিশি আইন : ক) Police Act, 1861 — বিদ্রোহ দমন ও জননিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত পুলিশ বাহিনীর ক্ষমতা নির্ধারণ।
খ) Special Powers ধারার উৎস আইনসমূহ — ব্রিটিশ আমলের দমনমূলক “Public Safety” ধাঁচের বিধান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও রক্ষিত হয়।
এই আইন স্বাধীন দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়, এ আইন ঔপনিবেশিক শাসকদের জন্য প্রযোজ্য।
৩. ভূমি ও রাজস্ব আইন :
ক) Land Acquisition Act, 1894 — রাষ্ট্রের নামে জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণের ক্ষমতা।
খ) Registration Act, 1908 — জমি ও সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। এই আইনও স্বাধীন দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।
৪. সংবাদ ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ আইন :
ক) Press and Registration of Books Act, 1867 — সংবাদপত্র নিবন্ধন ও সেন্সরশিপ।
খ) Official Secrets Act, 1923 — রাষ্ট্রের গোপন তথ্য প্রকাশকে অপরাধ ঘোষণা করে সংবাদমাধ্যম দমন।
এই আইনের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বদলে শাসকদের অপকর্ম আড়াল করার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
৫. অন্যান্য শোষণমূলক আইন :
ক) Arms Act, 1878 — সাধারণ জনগণের হাতে অস্ত্র রাখার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
খ) Explosives Act, 1884 — রাজনৈতিক আন্দোলন ও বিদ্রোহ ঠেকাতে ব্যবহৃত।
গ) Public Gambling Act, 1867 — জনজীবনের নানা দিকের উপর নিয়ন্ত্রণ।
এই আইনের মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য দাবির আন্দোলন এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমনপীড়ন করা হয়, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা করত।
১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২-এ “বিদ্যমান আইন” বলতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রযোজ্য সব আইনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যদি না তা সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ফলে উপরোক্ত ব্রিটিশ যুগের অধিকাংশ আইন কার্যত বহাল থেকে যায় এবং আজও বলবৎ রয়েছে।
বাংলা-ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের শোষণের হাতিয়ার ছিল, তাদের আইন সম্বলিত সংবিধান। একইভাবে বাহাত্তরের সংবিধান হলো, বাংলাদেশি শাসকদের শোষণের হাতিয়ার!
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্টপার্টি-বিএইচপি।


