সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশ–ভারত উত্তেজনাকে যদি কেবল কূটনৈতিক প্রটোকল ভাঙা বা কয়েকটি উগ্র সংগঠনের বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হয়, তবে মূল চিত্রটি আড়ালেই থেকে যাবে। বাস্তবে এই উত্তেজনার গভীরে রয়েছে নির্বাচনী রাজনীতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সংযোগ—যেখানে দুই রাষ্ট্রই ভিন্ন ভিন্ন চাপে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আর সেই ফাঁকে কূটনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশটি আন্তর্জাতিক নজরদারির কেন্দ্রে। নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা, সংখ্যালঘু ইস্যু—সবকিছুই এখন কেবল অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বয়ানের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে যে কোনো সহিংস ঘটনা কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হয়—কে তা ব্যবহার করবে, সেটিই প্রশ্ন।
ভারতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। দেশটি নিজেও নির্বাচনী চক্রের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এখন আর প্রান্তিক নয়—এটি মূলধারার শক্তি। বাংলাদেশ ইস্যু সেখানে একটি সুবিধাজনক হাতিয়ার: সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়া যায়, সীমান্তপারের ‘অন্য’কে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। ফলে নয়াদিল্লি, কলকাতা বা শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ কেবল স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ নয়—এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশের ফল।
কিন্তু এই খেলায় সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি হলো—রাষ্ট্রের নীরবতা। কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা। যখন বারবার হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির পরও দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া অনুপস্থিত থাকে, তখন বার্তা যায় স্পষ্ট—উগ্র গোষ্ঠীর আচরণ কার্যত প্রশ্রয় পাচ্ছে।
বাংলাদেশও এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে—চীনের প্রভাব বাড়ছে, যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় হচ্ছে, আর ভারত তার আঞ্চলিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে মরিয়া। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ভারতের নিরাপত্তা ও প্রভাবের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন কূটনীতি বাস্তববাদী হিসাবের বদলে আবেগ ও জনতাবাদে চালিত হতে থাকে। বাংলাদেশে নির্বাচন সামনে রেখে যদি প্রতিটি সংকটকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, আর ভারতে যদি প্রতিটি বাংলাদেশি ঘটনা ‘হিন্দু নির্যাতন’-এর ছকে ফেলা হয়—তাহলে সম্পর্কের জায়গা সংকুচিত হবেই।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরকে বাদ দিয়ে স্থিতিশীল থাকতে পারে না। উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরের কৌশল, বাণিজ্য করিডর, জ্বালানি—সবকিছুতেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একইভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এই কারণে বর্তমান উত্তেজনা শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, এটি আঞ্চলিক ঝুঁকিও তৈরি করছে। যদি এই শূন্যতা তৈরি হয়, তবে সেখানে তৃতীয় শক্তির প্রবেশ অনিবার্য—যা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য আরও জটিল করে তুলবে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। ভারতের উচিত নির্বাচনী ও আদর্শিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। বাংলাদেশের উচিত নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনার মধ্যেও আইন, তদন্ত ও ভাষার ক্ষেত্রে এমন সংযম দেখানো, যা আন্তর্জাতিক আস্থাকে শক্তিশালী করে।
নির্বাচন শেষ হবে, সরকার বদলাতে পারে—কিন্তু প্রতিবেশী বদলায় না। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যদি উগ্রতা ও জনতাবাদের কাছে পরাজিত হয়, তবে সেই ক্ষতি কেবল আজকের নয়, পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যঅন
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


