সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশ আবার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ঐতিহাসিক গণভোট। তাত্ত্বিকভাবে এটি গণতন্ত্রের এক অনন্য সুযোগ—জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নির্ধারণ করবে। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন উঠেছে ভিন্ন জায়গায়: যে অন্তর্র্বর্তী সরকার নিজেকে নিরপেক্ষ বলে দাবি করে, সেই সরকারই কেন একটি নির্দিষ্ট উত্তরের পক্ষে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে প্রচার চালাচ্ছে?
সরকারের যুক্তি স্পষ্ট—সংস্কারই তাদের ম্যান্ডেট, আর সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রয়োজন। এই বক্তব্যে নৈতিক আবেদন আছে। সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্র এগোয় না, তা সত্য। কিন্তু গণতন্ত্রে প্রশ্ন কেবল লক্ষ্য নয়, পদ্ধতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়, তবেই তা টেকসই হয়।
সমস্যা শুরু হয় এখানেই। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সরকার নয়, বরং একটি নির্বাচনকালীন অন্তর্র্বর্তী প্রশাসন। যার প্রধান দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। এই সরকার কোনো দলের প্রতিনিধি নয়, কোনো রাজনৈতিক ইশতেহারের বাহকও নয়। সে কারণে ঐতিহাসিকভাবে এমন সরকারকে ‘নিউট্রাল রেফারি’ হিসেবে দেখা হয়—যার কাজ খেলা পরিচালনা করা, গোল করা নয়।
কিন্তু এবার সেই রেফারিই মাঠে নেমে একটি দলে জোরে জোরে উৎসাহ দিচ্ছে।
আইনজ্ঞদের বড় অংশের আপত্তি এখানেই। সরকার যখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালায়, তখন সেটি কেবল মতপ্রকাশ নয়—তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ। সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যাংকারদের প্রচারে নামানো হচ্ছে; সরকারি অর্থে পোস্টার, বার্তা, সভা হচ্ছে। এতে সাধারণ ভোটার কেবল মতামতের মুখোমুখি হন না, মুখোমুখি হন রাষ্ট্রের ইঙ্গিতের—কোনটা ‘ভাল’ ভোট।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর সমস্যা আছে। যে কর্মকর্তারা নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ করবেন, তাঁদেরই আগে একটি পক্ষের প্রচারে যুক্ত করা হচ্ছে। এরপর তাঁদের কাছ থেকেই আমরা আশা করছি নিরপেক্ষতা। এটা কেবল আইনি ঝুঁকি নয়, নৈতিক সংকটও।
আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন এসেছে গণভোটের কাঠামো নিয়ে। চারটি বড় সংস্কার প্রশ্ন একসঙ্গে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’তে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কোনো ভোটার যদি দ্বিকক্ষ সংসদের পক্ষে থাকেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বিপক্ষে—তাহলে তিনি কী করবেন? এই কাঠামো আসলে জনগণকে পছন্দ করার সুযোগ কমিয়ে দেয়, এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়—এমন সন্দেহ অমূলক নয়।
সরকার আন্তর্জাতিক উদাহরণ দিচ্ছে—ব্রেক্সিট, স্কটল্যান্ড, তুরস্ক, ফ্রান্স। কিন্তু একটি মৌলিক পার্থক্য অনুচ্চারিত থেকে যাচ্ছে। সেসব ক্ষেত্রে সরকার ছিল নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার। তারা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রচার করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নির্বাচিত নয়, রাজনৈতিক সরকারও নয়। তাদের বৈধতা এসেছে কেবল নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি থেকে। সেই নিরপেক্ষতাই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে পুরো প্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
সংস্কার অবশ্যই দরকার। জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাব সময়োপযোগী ও সাহসী। প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমা, দ্বিকক্ষ সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা—এসব নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু আলোচনা হওয়া গণতন্ত্রের শক্তি। তবে সংস্কার আর সংস্কারের নামে ফল নির্ধারণ—এই দুইয়ের পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম হলেও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণভোটের সৌন্দর্য এখানেই—রাষ্ট্র প্রশ্ন করবে, জনগণ উত্তর দেবে। রাষ্ট্র যদি আগেই ঠিক করে দেয় কোন উত্তরটি ‘সঠিক’, তাহলে সেটি গণভোট থাকে না; সেটি হয়ে যায় অনুমোদন সংগ্রহের আনুষ্ঠানিকতা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সংস্কার বনাম সংস্কারবিরোধী নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—
আমরা কি এমন একটি গণতান্ত্রিক সংস্কার চাই, যা নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে আসে?
নাকি আমরা এমন সংস্কার চাই, যার পথেই নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিতে হয়?
কারণ ইতিহাস বলে, নিরপেক্ষতা হারিয়ে যে সংস্কার আসে, তা অনেক সময় সংস্কারের চেয়ে বিভাজনই বেশি তৈরি করে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পর্টি-বিএইচপি।


