অনলাইন ডেস্ক

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। শনিবার ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে তেহরান দাবি করেছে।
এর পরপরই ইরান প্রতিশোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেয় এবং জানায়, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধের পটভূমি: ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে দেখছে তেহরান
২০২৫ সালের জুন মাসের ১২ দিনের সংঘাতের চেয়ে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ইরান এখন সরাসরি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian বলেছেন, প্রতিশোধ নেওয়া দেশের “অপরিহার্য দায়িত্ব এবং বৈধ অধিকার”। তার ভাষায়, “এই হামলার জবাব দেওয়া হবে কৌশলগত ও সিদ্ধান্তমূলক উপায়ে।”
ইরানের প্রধান সামরিক সক্ষমতা
১. ব্যালিস্টিক মিসাইল ভাণ্ডার
ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় ব্যালিস্টিক মিসাইল ভাণ্ডার রয়েছে।
-
দীর্ঘপাল্লার মিসাইল: ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা। এর আওতায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো রয়েছে।
-
স্বল্পপাল্লার মিসাইল:
-
Fateh-110
-
Zolfaghar
-
Qiam-1
দ্রুত উৎক্ষেপণযোগ্য এবং স্বল্প সময়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
-
-
মধ্যপাল্লার মিসাইল:
-
Shahab-3
-
Emad
-
Sejjil
-
Kheibar Shekan
এসব মিসাইল পুরো অঞ্চলকে ইরানের কৌশলগত আওতায় নিয়ে এসেছে।
-
২. ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন
-
ক্রুজ মিসাইল:
Soumar মডেলের ক্রুজ মিসাইল প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়ায় এগুলো রাডারে শনাক্ত করা কঠিন। -
ড্রোন ও ‘স্যাচুরেশন ট্যাকটিক’:
স্বল্পমূল্যের কিন্তু কার্যকর ড্রোন ঝাঁক বেঁধে হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত বা দুর্বল করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কৌশল ইরানের সামরিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
৩. ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’
ইরান মাটির গভীরে টানেল, সুরক্ষিত ঘাঁটি ও ‘মিসাইল সিটি’ তৈরি করেছে বলে দাবি করে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দফার হামলায় এসব স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
হরমুজ প্রণালি: অর্থনৈতিক চাপের কৌশল
Strait of Hormuz বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। ইরান নৌ মাইন, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে এই পথে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ডেনিশ শিপিং কোম্পানি Maersk হরমুজ প্রণালির রুটে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সংঘাত কি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে?
ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লেবাননের Hezbollah এবং ইয়েমেনের Houthi movement তেহরানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সংঘাত সীমিত প্রতিশোধমূলক অভিযানের গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক বা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও দুই পক্ষের অবস্থান এখনো কঠোর।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংকট বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।


