হাফেজ সাইফুল্লাহ মনসুর

দাড়ি–টুপি–জুব্বাহ পড়লেই ইসলাম, আর না পড়লেই ইসলাম বহির্ভূত—এই ধারণা শুধু ভুল নয়, এটি কুরআন, হাদিস, ইতিহাস এবং সব ধর্মের মৌলিক শিক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি। ইসলাম কোনো ইউনিফর্ম না, কোনো লোক দেখানো ফরমাল ধর্মও না। ইসলাম হলো তাওহিদ, আত্মশুদ্ধি, জ্ঞান, ন্যায় ও নিষ্কাম কর্ম।
রাসূল ﷺ স্পষ্ট করে বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা, শরীর বা বাহ্যিক রূপের দিকে তাকান না; তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও কর্মের দিকে।” (সহিহ মুসলিম ২৫৬৪)। আল্লাহ যখন বাহ্যিকতা দিয়ে বিচার করেন না, তখন মানুষ কোন সাহসে বাহ্যিকতা দিয়ে ঈমান, তাকওয়া বা বেলায়েত মাপতে যায়—এই প্রশ্নের কোনো যুক্তিসংগত জবাব নেই।
কুরআনে নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ্জ—সব কিছুর ফরজ স্পষ্টভাবে বলা আছে। কিন্তু কোথাও দাড়ির দৈর্ঘ্য, টুপির ধরন বা জুব্বাহর কাট ফরজ হিসেবে বলা নেই। কারণ খুব পরিষ্কার—এগুলো ধর্ম নয়, এগুলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে ধর্ম বানানোই বিদআত। কুরআন নিজেই বলে: “তাকওয়ার পোশাকই উত্তম।” (সূরা আরাফ ৭:২৬)। তাকওয়া কোনো কাপড় না, তাকওয়া হলো চেতনা, বিবেক ও আল্লাহভীতি।
গান শোনা নিয়ে যারা ফতোয়া ঝাড়ে, তারা অর্ধেক জ্ঞান নিয়ে পুরো ইসলাম বিচার করে। কুরআনে কোথাও বলা নেই যে সুর বা গান নিজেই হারাম। রাসূল ﷺ বিয়েতে গান থামাননি, ঈদে দাফ থামাননি। তিনি থামিয়েছেন অশ্লীলতা ও ফাহাশা। ইমাম ইবনে হাযম স্পষ্ট বলেছেন, গান হারাম প্রমাণ করার মতো কোনো সহিহ দলিল নেই। ইমাম গাজ্জালি বলেছেন, সঙ্গীত মানুষের ভেতরের অবস্থাকে প্রকাশ করে—হৃদয় পবিত্র হলে তা পবিত্রতাই বাড়ায়। কাজেই অশ্লীল গান হারাম, সুর নিজে হারাম নয়।
বেলায়েতের সাথে পোশাকের কোনো সম্পর্ক নেই—এটা অস্বীকার করা মানে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করা। আল্লাহ বলেন: “জেনে রাখো, আল্লাহর ওলিদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হয় না।” (সূরা ইউনুস ১০:৬২)। এখানে কোথাও বলা হয়নি তারা কেমন পোশাক পরবে। কারণ ওলি চেনা যায় চেহারা দিয়ে না, চেনা যায় তার আত্মিক প্রভাব, জ্ঞান ও কর্ম দিয়ে। ইমাম জুনায়েদ (রহ.) বলেছেন, ওলিদের একদল এমন আছেন যাদের মানুষ চিনতেই পারে না।
ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য ওলি আল্লাহর কাছে বিশেষ ছিলেন, অথচ তারা তথাকথিত ফরমাল ইসলামি পোশাকে ছিলেন না। বায়েজিদ বস্তামি (রহ.) বহু সময় সাধারণ পোশাকে থাকতেন, মানুষ তাকে পাগল বলত। ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) রাজা থেকে ফকির হয়েছিলেন, কোনো বিশেষ বাহ্যিক পরিচয় ছাড়াই আল্লাহর ওলি হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। উওয়াইস আল-কারনি (রহ.) কোনো আলেমি পোশাক বা বাহ্যিক মর্যাদা ছাড়াই রাসূল ﷺ–এর কাছে এমন উচ্চ মর্যাদা পেয়েছেন যে সাহাবিদেরও তাকে চিনতে বলা হয়েছিল। বহু মজজুব ওলি বাজারে–ঘাটে সাধারণ মানুষের মতো ছিলেন, বাহ্যিকভাবে আলাদা করা যেত না।
এই সত্য শুধু ইসলামেই নয়, সব ধর্মেই প্রতিষ্ঠিত। খ্রিস্টধর্মে বাইবেল বলে: “The Kingdom of God is within you.” (Luke 17:21)। অর্থাৎ ঈশ্বরের রাজ্য বাহিরে নয়, মানুষের ভেতরে। যিশু নিজেই ফারিসিদের বাহ্যিক ধার্মিকতাকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছিলেন। হিন্দুধর্মে ভগবদ গীতা বলে: “মানুষ তার কর্ম দ্বারাই পরিচিত।” (গীতা 3:19) এবং “আত্মজ্ঞানই মুক্তির পথ।” (গীতা 4:38)। বৌদ্ধধর্মে গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, নিজেকে জানাই মুক্তির পথ। দর্শনের ভাষায় সক্রেটিস বলেছেন, “Know thyself.”
মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)–এর ঘটনা কুরআনেই প্রমাণ করে—সব সত্য সবার জন্য নয়। নবী মুসা (আ.) শরিয়তের নবী হয়েও খিজির (আ.)–এর সাথে থাকতে পারেননি। আজ যারা বাহ্যিকতা দিয়ে বিচার করছে, তারা না মুসা, না খিজির—কিন্তু বিচারক সেজে বসেছে।
কারামত প্রসঙ্গে কথা একেবারে পরিষ্কার। কারামত কোনো দাবি নয়, কারামত ফল। ইমাম নববী বলেছেন, কারামত প্রকাশ পায় শুধু সেই ব্যক্তির হাতে যে আল্লাহর পথে থাকে। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, আল্লাহর বিরোধীর হাতে যা ঘটে তা ভেলকি, কারামত নয়। যদি আমি সঠিক পথে না থাকতাম, তাহলে ধারাবাহিকভাবে কাজ সম্পন্ন হতো না, মানুষ উপকৃত হতো না, আল্লাহ সহায়তা করতেন না। আল্লাহ বাতিলকে ধারাবাহিকভাবে সাহায্য করেন না। কুরআন বলেছে: “আল্লাহ জালিমদের পথ সুগম করেন না।” (সূরা আনআম ৬:১২৫)।
শেষ কথা একটাই। দাড়ি–টুপি–জুব্বাহ ধর্ম নয়। গান নিজে হারাম নয়, অশ্লীলতা হারাম। বেলায়েত পোশাকে নয়, সত্তায়। পরিচয় কথায় নয়, কর্মে। সবাই খিজির বোঝে না, আর যে বোঝে না—তার বিচার করার অধিকারও নেই।


