অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই অস্থির করেনি, বরং বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান পরমাণু ব্যবস্থার ভিত্তিকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ, বেসামরিক পরমাণু বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
পরমাণু নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক Kenneth Luongo-এর মূল্যায়নে, ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া বৈশ্বিক পরমাণু ব্যবস্থার ওপর “শেষ হাতুড়ির আঘাত” হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক আস্থাহীনতা বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে তুলেছিল। বর্তমান সংঘাত সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সক্রিয় পরমাণু কর্মসূচির ওপর সরাসরি সামরিক হামলার নজির
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ একটি নতুন ও বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। কারণ এবার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সক্রিয় পরমাণু কর্মসূচিকে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে।
অতীতে Israel ইরাক ও সিরিয়ার নির্মাণাধীন গবেষণামূলক পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালালেও, চলমান কার্যকর কর্মসূচিকে পুরোপুরি অকার্যকর করার এমন প্রচেষ্টা ইতিহাসে খুবই বিরল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, গবেষণা অবকাঠামো এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং সিআইএ পরিচালক John Ratcliffe উভয়েই দাবি করেছেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনাগুলো কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
হারিয়ে যেতে পারে অস্ত্র-উপযোগী ইউরেনিয়াম
এই ধ্বংসযজ্ঞের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইরানের ফিশাইল মেটেরিয়াল বা অস্ত্র-উপযোগী পরমাণু জ্বালানির নিরাপত্তা নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৪০০ কেজি সমপরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম Isfahan Nuclear Technology Center-এর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতিটি অনেকটা ১৯৯০-এর দশকে Soviet Union ভেঙে পড়ার পর সৃষ্ট “নিয়ন্ত্রণহীন পরমাণু ঝুঁকি”-র মতো। তবে সেই সময় United States ও Russia যৌথভাবে নিরাপত্তা সহযোগিতা করেছিল। বর্তমান বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশে ইরানের ক্ষেত্রে এমন সহযোগিতা বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যুদ্ধ থামবে না: নেতানিয়াহুর কঠোর বার্তা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং পরমাণু অবকাঠামো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত অভিযান থামবে না।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা ইউরেনিয়াম উদ্ধারে ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সহায়তা নিতে বাধ্য হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ধার করা যেমন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সেগুলো অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়াও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়।
প্রশ্নের মুখে আইএইএ’র কার্যকারিতা
এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা International Atomic Energy Agency-এর সীমাবদ্ধতাও সামনে এনে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে যখন নতুন নতুন দেশ পরমাণু শক্তি কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছে, তখন আইএইএ’র বর্তমান কাঠামো, জনবল ও বাজেট দিয়ে সব দেশের কার্যক্রম কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শান্তিপূর্ণ পরমাণু ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে একতরফা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
নতুন পরমাণু প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান পরমাণু শক্তিগুলোর ওপরও পড়ছে। Saudi Arabia, United Arab Emirates, Egypt এবং Turkey নিজেদের বেসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি এখন আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। সৌদি আরব নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ধরে রাখতে চায়, যা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের “গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড” নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে China ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো এ ক্ষেত্রে নীতিগত নমনীয়তা দেখাতে হতে পারে।
রাশিয়া-চীনের উত্থানে চাপে যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের বেসামরিক পরমাণু বাজারেও এখন বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাশিয়া আকর্ষণীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার সুবিধা দিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করছে। অন্যদিকে চীন বিশাল শিল্প সক্ষমতা নিয়ে দ্রুত বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রকে তার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে। কারণ, একটি পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু প্রযুক্তি রপ্তানি নয়—এটি সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে অন্তত এক শতাব্দীব্যাপী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিতে পরমাণু প্রযুক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতাই বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।


