বিশেষ প্রতিবেদন

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মহলে দেওয়া সাম্প্রতিক মন্তব্য ওয়াশিংটন–কারাকাস সম্পর্ককে নতুন করে সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে তেল জাতীয়করণকে ‘চুরি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এ দাবি বিতর্কিত, আর বাস্তবে ভেনেজুয়েলার তেল–রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা, নৌ–অবরোধ ও ক্ষমতা বদলের ইঙ্গিত এই উত্তেজনাকে বহুমাত্রিক করেছে।
পটভূমি
- ভেনেজুয়েলা ১৯৭৬ সালে তেলখাত জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিভিএসএ’র অধীনে আনে।
- ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ অবশিষ্ট বিদেশি প্রকল্পও জাতীয়করণ করলে এক্সন মোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো কার্যত দেশ ছাড়ে।
- জাতীয়করণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু হয়; ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের সালিশি ট্রাইব্যুনাল এক্সন মোবিলকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় (প্রক্রিয়া চলমান)।
সাম্প্রতিক দাবি ও বক্তব্য
- স্টিফেন মিলারের দাবি, “আমেরিকানদের শ্রম ও মেধায় ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প গড়ে উঠেছিল” এবং জাতীয়করণ ছিল ইতিহাসের “সবচেয়ে বড় চুরি”।
- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে একই সুরে বলেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ‘চুরি’ করেছে এবং নৌ–অবরোধ আরও জোরদার হবে।
- ভেনেজুয়েলার উপকূলে তেল ট্যাংকার জব্দ ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌ–হামলার ঘটনাকে কারাকাস ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ হিসেবে নিন্দা জানায়।
আইনি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
- আন্তর্জাতিক আইনের ‘প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌমত্ব’ নীতিমতে ভূখণ্ডের ভেতরের তেল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্পদ।
- প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ থাকলেও জাতীয়করণ রাষ্ট্রের বৈধ নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃত—যদিও ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে সালিশি ও মামলা চলতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা ও ‘মাদক’ বয়ান
- ২০১৯ সালে পিডিভিএসএ’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়; ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি জোরদার।
- ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের অভিযোগ তোলা হলেও নির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
- ‘কার্টেল দে লোস সোলেস’কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার উদ্যোগও বিতর্কিত।
ক্ষমতা বদলের ইঙ্গিত ও তেলখাতের ভবিষ্যৎ
- যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনা চলছে—মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে বেসরকারি তেল কোম্পানির ভেনেজুয়েলায় প্রত্যাবর্তন সম্ভব কি না।
- তবে কম তেলের দাম ও বিকল্প তেলক্ষেত্রের প্রাচুর্যে শিল্পখাতের আগ্রহ সীমিত বলে ইঙ্গিত।
- বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ক্ষমতায় এলে তেলখাত বেসরকারিকরণ ও বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলমজুত—বিশ্বের বৃহত্তমগুলোর একটি—এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ান ও ভূ–রাজনৈতিক চাপের অংশ হলেও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে এর সংঘাত স্পষ্ট। নিষেধাজ্ঞা ও নৌ–তৎপরতা উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, অথচ তেলখাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নির্ভর করছে স্থিতিশীলতা ও বৈধতার ওপর।
তেলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলা দ্বন্দ্ব এখন কেবল কূটনৈতিক নয়; এটি আইনি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মাত্রায় বিস্তৃত। সমাধান নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে রাজনৈতিক সংলাপ, নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা এবং ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।


