বুধবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৬

বেসরকারি খাত সংকটে: আস্থা হারানো ব্যবসা, থমকে যাওয়া অর্থনীতি

পাঠক প্রিয়

সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত বেসরকারি খাত আজ গভীর সংকটে। মামলা–হামলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হার—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক হয়রানি ও মিডিয়া ট্রায়াল, যা বেসরকারি খাতে আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

যেকোনো ব্যবসার প্রধান পুঁজি হলো আস্থা ও বিশ্বাস। কিন্তু যখন শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন, তখন শুধু ব্যক্তি ব্যবসায়ী নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অনেক উদ্যোক্তার কণ্ঠেই এখন একটাই অভিযোগ—এ দেশে যেন ব্যবসা করাই অপরাধ।

প্রতিকূল বাস্তবতায় বিনিয়োগ স্থবির

বর্তমান বাস্তবতায় ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রতিকূল। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নেই। ব্যাংক ঋণের সুদহার গিয়ে ঠেকেছে ১৬ শতাংশে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শ্রম আইন সংস্কার নিয়ে দুশ্চিন্তা নতুন বিনিয়োগের পথ কার্যত রুদ্ধ করে দিয়েছে।

ফলাফল হিসেবে নতুন বিনিয়োগে কেউ এগোতে সাহস পাচ্ছেন না। বরং পুরোনো বিনিয়োগও এখন হুমকির মুখে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন। এটি শুধু শিল্পখাতের সংকট নয়—এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।

পরিসংখ্যানে বিনিয়োগের স্থবিরতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত আগস্ট মাসে আমদানি দায় নিষ্পত্তি দাঁড়িয়েছে ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। এর মূল কারণ—মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির উল্লেখযোগ্য হ্রাস। অর্থাৎ নতুন কারখানা স্থাপন বা শিল্প সম্প্রসারণ কার্যত থেমে গেছে।

যদিও নতুন এলসি খোলা সামান্য বেড়েছে, তবে তা মূলত ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ না থাকলে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। উচ্চ সুদের হার ও ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

পাঁচ মাস পর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি আবারও নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে গেছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি; বরং আগের মাসগুলোর নিম্নমুখী ধারা আরও তীব্র হয়েছে। এতে শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দাভাব তৈরি হয়েছে, কমছে নতুন কর্মসংস্থান, অর্জিত হচ্ছে না লক্ষ্যমাত্রার জিডিপি প্রবৃদ্ধি।

আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পাঁচটি বড় বাধার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সীমিত অর্থায়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বৈষম্যমূলক করকাঠামো ও দুর্নীতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে বিনিয়োগ পরিবেশে তেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।

অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে—নতুন মার্কিন শুল্ক, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগ ও রপ্তানিকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে ধাক্কা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ২৬টি দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। মোট রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ২.৬৩ শতাংশ। শুধু পোশাক নয়—শাকসবজি, মাছ, হিমায়িত খাদ্য ও অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাজারে স্থবিরতা আরও গভীর হয়েছে।

আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনেও স্বীকার করা হয়েছে—দেশের অর্থনীতি সংকটময় সময় পার করছে। দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই বাস্তবতায় আগামী সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসায়ীরা যেন ভয়হীন পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ‘আমরা এর লোক, তারা তার লোক’—এই বিভাজনের রাজনীতি পরিহার না করলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

মনে রাখতে হবে, কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ব্যবসায়ীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তাদের পরিচয় একটাই—তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার যোদ্ধা। তাদের বাদ দিয়ে নয়, হয়রানি করে নয়—আস্থার হাত ধরেই গড়তে হবে আগামীর বাংলাদেশ।

সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।

সর্বশেষ সংবাদ

ময়মনসিংহ ও সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক দেশের দুই অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য এই দুর্যোগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০...

ডিএমপিতে পাঁচ পরিদর্শক বদলি

অনলাইন ডেস্ক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচজন পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. আমীর খসরুর স্বাক্ষরিত এক আদেশে...

যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে চীন—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

অনলাইন ডেস্ক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানকে নতুন করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন—এমন তথ্য দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন...

হামের প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত ১৬৯

অনলাইন ডেস্ক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫...

কাতারে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদিও...

জনপ্রিয় সংবাদ