
একজন নামাজ আদায়কারী রুকু-সিজদার মধ্য দিয়ে নিজেকে আল্লাহতালার কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণভাবে বিলীন করে দেন। সুবহানা রব্বিয়াল আলা মহান আল্লাহতালার শ্রেষ্ঠত্ব ও চরম প্রশংসাসূচক বাক্য। মুখে আমরা ওই বাক্য পাঠ করে আল্লাহতালার প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করি। কিন্তু আমাদের দেহ, মন, মস্তিষ্ক, চিন্তা-চেতনা, অনুভব, অনুভূতি, ইন্দ্রীয়, অন্তর ও সমস্ত অনু-পরমাণু বিমূর্ত ভাষায় আল্লাহতা’লার কাছে কী আকুতি জানায়? দেহ-মন মাটিতে মাথা রেখে, নাকে ক্ষত দিয়ে বলে, হে আমার রব, আমার প্রতিপালক, আমার রিযিক দাতা, আমার স্রষ্টা, আমার প্রাণ দাতা, ইহকাল-পরকালের মালিক, পরম দয়ালু, সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ, আমি তোমার গোলাম, আমি তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম, তুমি দয়া করে আমার আত্মসমর্পণের এই নামাজ কবুল করো, আমাকে ক্ষমা করো, আমাকে বিশুদ্ধ করে নামাজ পড়ার তৌফিক দান করো। এ কারণে যারা নামাজের মধ্য দিয়ে আল্লাহতালার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন, তারা দীর্ঘ সময় সিজদায় পড়ে থাকেন এবং নামাজ শেষে মুনাজাত করে নামাজের হক্ব আদায় করেন। কিন্তু যারা অনুষ্ঠানসর্বস্ব নামাজ পড়েন, তাদের বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না।
এমন কোনো নামাজী নেই যে, যার নামাজ পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ হয়, কোনো প্রকার ভূল-ত্রুটি হয় না। নামাজ পড়ার সময় নামাজীর বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, বাঙালি মুসলমান নামাজীদের মাতৃভাষা আরবী নয়। সুতরাং কুরআন মজিদের আয়াতে কারিমা পাঠ করার সময় আমাদের ভূল হতেই পারে। নামাজের আদবরক্ষা করা অনেক কঠিন কাজ। কিভাবে আদব রক্ষা করতে হয় তা অধিকাংশ নামাজীর জানা নেই। যেমন, আল্ল্লাহতালার সম্মুখে দন্ডায়মান হয়ে আল্লাহর কালাম পাঠ করা; কোন্ আয়াত কিভাবে, কতটা উচ্চস্বরে, কতটা নিম্নস্বরে কি ধরনের আদবরক্ষা করে পাঠ করতে হবে তা আমাদের জানা নেই। দেহ-মন কীভাবে বিগলিত করে আদবের সাথে রুকু-সিজদা করতে হবে সেই শিক্ষা আমাদের অধিকাংশ নামাজীর নেই। যেভাবে কুরআন মজিদ বিশুদ্ধ করে পাঠ না করলে কুরআন মজিদ অভিসম্পাত করে। তেমনি নামাজ বিশুদ্ধ করে না পড়লে নামাজ অভিসম্পাত করে। সুতরাং অজিফা কালাম পাঠ করে মুনাজাতের মাধ্যমে কাকুতি-মিনতি করে মহান আল্লাতা’লার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার মধ্য দিয়ে নামাজ শুদ্ধ করতে হয়। এছাড়া মুনাজাত নামাজের অংশ হোক কিংবা না হোক সেটা মূল কথা নয়। মূল কথা হলো, মহানবী রসূলে করিম (স) নামাজের পর মুনাজাত করতেন কি-না? নবীজি (স) যদি নামাজের পর মুনাজাত করে থাকেন, তাহলে মুনাজাত নামাজের অংশ নয়, এই অজুহাতে আমরা মুনাজাত বর্জন করার কে?
এক শ্রেণির নামাজী আছেন যারা নামাজের পর মুনাজাত করেন না। তারা বলেন, মুনাজাত নামাজের অংশ নয়। নামাজ শুরু হয় ‘আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে আর শেষ হয় ডানে-বামে সালাম ফিরানোর মধ্য দিয়ে। নামাজ ‘আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে শুরু হয় আর ডানে-বামে সালাম ফিরানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কিন্তু অজু করাও তো নামাজের অংশ নয়, তাই বলে কী অজু করা ছাড়া নামাজ হবে? অজু করা হলো, নামাজের পূর্ব-প্রস্তুতি পর্ব। এই প্রস্তুতি পর্ব ছাড়া নামাজ পড়া যায় না। অনুরূপ নামাজ শেষে মুনাজাত করা, তাসবীহে ফাতেমি পাঠ করা, দরুদ শরীফ পাঠ করা, বিভিন্ন অজিফা পাঠ করা হলো, নামাজের হক আদায় করা বা নামাজের সমাপ্তি পর্ব। নামাজের প্রস্তুতি পর্বের মতই হলো নামাজের সমাপ্তি পর্ব। নামাজের প্রস্তুতি পর্ব যেমন নামাজের অংশ না হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত গুরুত্বপূণর্, তেমনি নামাজের সমাপ্তি পর্ব মুনাজাত নামাজের অংশ না হওয়া সত্ত্বেও মুনাজাত ছাড়া নামাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা পাওয়ার আর কোনো বিকল্প পথ নেই।
মহান আল্লাহতালা বান্দার প্রার্থনা শুনতে ভালোবাসেন। বান্দার আনুগত্যের প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ মেলে আল্লাহর কাছে তার আকুতি-মিনতির মধ্য দিয়ে। আল্লাহতা’লা বান্দার আকুতি-মিনতি আর চোখের জলে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর রহমতের দরজা খুলে দেন। মহানবী রসূলে করিম (স) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে বান্দার দুয়ার চেয়ে প্রিয় কিছু নেই (তিরমিজি শরীফ)।
মুনাজাতের মধ্য দিয়ে আল্লাহতা’লার কাছে ইহকাল ও পরকালের সাহায্য কামনা করা হয়। মহান আল্লাহতা’লা যে সাহায্য করতে পারেন কিংবা সাহায্য করেন অনেকেই তা বিশ্বাস করেন না। তাদের মুনাজাত না করার মূল উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানদের ঈমান, ইবাদত-বন্দিগি ও আদব-আখলাক ধ্বংস করে দেয়া। মহান আল্লাহতালার সম্মুখে বে-আদবী ও অহঙ্কার প্রদর্শন করা। নামাজ হলো, আল্লাহতালার সাথে বান্দার সাক্ষাৎ ও সম্পর্ক সৃষ্টির মজলিশ। আল্লাহতা’লা বলেন, আস-সালাতু মিরাজ-উল-মুমিনীন। অর্থ : নামাজ হলো মুমিনের জন্য মিরাজ বা আল্লাহতালার সাথে সাক্ষাতের অনুষ্ঠান।
নামাজের মজলিশে মহান আল্লাহতালা স্বয়ং, বিশিষ্ট ফিরিস্তাগণ এবং স্বাক্ষী হিসেবে (রুহানিভাবে) মহানবী রসূলে করিম (স) ও আল্লাহতালার সলেহিন বান্দাগণ উপস্থিত থাকেন। কোনো নামাজী যদি আল্লাহতালার সম্মুখে নামাজ পড়ার পর আল্লাহতালার সাহায্য কামনা ও ক্ষমা প্রার্থনা না করেন, আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া আদায় না করেন, আল্লাহতালাকে কিছু না বলে আদবহীনভাবে উঠে চলে যান, তাহলে তার নামাজ কী আল্লাহতালা কবুল করবেন? কিংবা তার সাথে কী আল্লাহতালার সম্পর্ক সৃষ্টি হবে?
মুসলমানদের নামাজ যাতে কবুল না হয়, মুসলমানরা যাতে আল্লাহতালার সাহায্য লাভ করতে না পারেন, এজন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তারা নামাজের পর মুনাজাত না করার সংস্কৃতি চালু করেছিল।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি ।


