
বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কেবল আশাবাদী ভাষ্য বা স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের গল্প দিয়ে বাস্তবতা আড়াল করা সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারকদের এখন কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—বর্তমান ঝুঁকিগুলো কি আমরা সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি, নাকি ভবিষ্যতের ওপর দায় ঠেলে দিচ্ছি?
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে বাংলাদেশের জন্য যে ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো কোনো তাত্ত্বিক সতর্কতা নয়; এগুলো বাস্তব ও চলমান। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। অর্থপাচার, কর ফাঁকি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি শুধু রাজস্ব হারানোর বিষয় নয়; এগুলো বৈধ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে দুর্বল করে। কঠোর আইন নয়, বরং কার্যকর প্রয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এখানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ। বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বিভক্ত হচ্ছে। শক্তিশালী দেশগুলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে পারে না। নীতিনির্ধারকদের এখন প্রশ্ন করতে হবে—আমাদের বাণিজ্য কূটনীতি কি যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়? আমরা কি কেবল কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি না? নতুন বাজার, আঞ্চলিক জোট ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব ছাড়া এই ঝুঁকি সামাল দেওয়া কঠিন।
ভূ-অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা—মূল্যস্ফীতি। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভোটার, শ্রমিক ও ভোক্তার প্রতিদিনের বাস্তবতা। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে, সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষয় করছে। সাময়িক স্বস্তি যথেষ্ট নয়; মূল্যস্ফীতির কাঠামোগত কারণগুলো মোকাবিলা না করলে সমস্যা ঘুরে ফিরে আসবে।
চতুর্থ ঝুঁকি অর্থনৈতিক ধীরগতি। বিনিয়োগে স্থবিরতা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা মিলিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, প্রবৃদ্ধি কমে গেলে প্রথম আঘাত পড়ে কর্মসংস্থানে। তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সবচেয়ে নীরব কিন্তু বিপজ্জনক ঝুঁকি ঋণের বোঝা। বাজেটে সুদ পরিশোধে ক্রমবর্ধমান ব্যয় উন্নয়ন ও মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত করছে। যদি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা না আসে, তবে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ আটকে পড়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল বার্তাটি পরিষ্কার—এই ঝুঁকিগুলো আলাদা নয়, একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অপরাধ দমন ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না, ভূ-অর্থনৈতিক কৌশল ছাড়া রপ্তানি টিকবে না, আর মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে না আনলে সামাজিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও সাহসী সিদ্ধান্ত। সুশাসন জোরদার, অপরাধ ও অবৈধ অর্থনীতি দমন, বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি—এই চার স্তম্ভের ওপরই ভবিষ্যতের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে থাকবে। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যতে, আর সেই মূল্য শুধু অর্থনীতির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


