বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রপতির অধীনে একটি সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত। প্রধান উপদেষ্টা শপথগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি সংবিধান সংরক্ষণ করবেন এবং কোনোভাবেই লঙ্ঘন করবেন না। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি ইসলামি রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছে যে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান বর্তমানে একক–আসন ভিত্তিক সরাসরি ভোটের (FPTP) পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের নির্বাচন একক-আসন ভিত্তিক ভোটে অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ প্রতিটি আসন থেকে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী সংসদ সদস্য হবেন। এখানে পিআর পদ্ধতির কোনো বিধান নেই। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা উভয়েই সংবিধান রক্ষার শপথ করেছেন। ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন করার ক্ষমতা তাদের নেই।
জামায়াতে ইসলামী ও ছয়টি ইসলামি দল দাবি করছে যে, জুলাই সনদ অনুসারে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তাদের মতে, জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির জন্য এই পরিবর্তন জরুরি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল নির্বাচনের আয়োজনকারী ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। তারা সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা রাখে না। পিআর পদ্ধতি চালু করা হলে তা হবে সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন।
যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করে, তবে তা হবে শপথ ভঙ্গ এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী। আদালত ও নাগরিক সমাজ এটি প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। অতএব, এটি রাজনৈতিক বৈধতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র সাংবিধানিক সংকটে পতিত হবে।
ভারতের সংবিধানে একক-আসন ভিত্তিক ভোট বাধ্যতামূলক, পিআর পদ্ধতি কেবল রাজ্যসভার আংশিক নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়। জার্মানির সংবিধানে স্পষ্টভাবে মিশ্র (FPTP + PR) পদ্ধতি নির্ধারিত। নেপাললে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পিআর পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতএব, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর পদ্ধতি প্রবর্তনও কেবল সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভব।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি সাংবিধানিক সরকার, যার কাজ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। প্রধান উপদেষ্টা শপথবাক্যে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করবেন না। তাই জামায়াতে ইসলামী ও ছয়টি ইসলামি দলের দাবি অনুযায়ী জুলাই সনদের ভিত্তিতে পিআর পদ্ধতির নির্বাচন আয়োজন করা আইনগতভাবে অসম্ভব।
বাংলাদেশে যদি সত্যিই পিআর পদ্ধতি চালু করার প্রয়োজন হয়, তবে তা করতে হবে নতুন সংসদ গঠনের পর সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব কেবল একটিই—সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করা।
জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি ইসলামি রাজনৈতিক দলের উচিৎ হবে, বিএনপির সাথে বিরোধ বৃদ্ধি না করে শান্তিপূর্ণভাবে যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজনে সরকারকে সহযোগীতা করা। যদি তারা বিরোধ বৃদ্ধি করেন এবং তাতে একটি ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাহলে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আকস্মিক আগমনের পথ সুগম হতে পারে। শেখ হাসিনার আগমন হলে রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সুফি সাগর সামস্, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


