
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী ঘটনা হলেও এর পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিপ্লবী সরকার বা সর্বদলীয় জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বাহাত্তরের সংবিধানের অধীনে উপদেষ্টা-নির্ভর সরকার গঠিত হয়, যা অভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী। এই সরকারের কার্যকলাপ কেবল রাজনৈতিক অনৈক্য সৃষ্টি করেনি, বরং অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকেও অস্বীকার করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, রাষ্ট্রকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল: একটি বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা, সর্বদলীয় জাতীয় সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে (১০ বছর) ক্ষমতায় থেকে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। এই প্রক্রিয়া অভ্যুত্থানকে কেবল সাময়িক পরিবর্তন নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বিপ্লব হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হতো।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বাহাত্তরের সংবিধানের কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো ছিল। অথচ এই সংবিধানই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা অভ্যুত্থানের প্রকৃত স্টেকহোল্ডার ছিলেন না; বরং তারা রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিনিধিত্বশীল এবং অভ্যুত্থানের ধারক নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী।
বিপ্লবী দল ও সংগঠনকে বাদ দিয়ে উপদেষ্টাদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল। এটা ছিল রাজনৈতিক অনৈক্য সৃষ্টির একটি বিষাক্ত বীজ। এই বীজ সর্বদলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিভাজন ও সন্দেহ সৃষ্টি করে। সংবিধানগত ভ্রান্তি ছিল, অপুরণীয় ক্ষতিকর একটি আত্মঘাতী কু-কর্ম। বাহাত্তরের সংবিধানের ভিত্তিতে সরকার পরিচালনার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়, অথচ এই সংবিধান অভ্যুত্থানের ঘোষিত চেতনার পরিপন্থী। এই সংবিধানের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী কাঠামোর কাছে বলি দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশের বিপ্লবী পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রজ্জ্বলিত সূর্য নিভে গেছে। সর্বদলীয় জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে নতুন সংবিধানের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হতে পারত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই ঐতিহাসিক সুযোগ বিনষ্ট করেছে এবং অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতায় রূপ দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের এক সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই সম্ভাবনাকে গলাটিপে হত্যা করেছে। রাজনৈতিক ঐক্যের বদলে বিভাজন, বিপ্লবী আদর্শের বদলে সুযোগসন্ধানী নেতৃত্ব এবং সংবিধান সংস্কারের বদলে পুরোনো কাঠামোর আশ্রয়—এ সবই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ব্যর্থ করেছে। ইতিহাসের বিচারে এটি শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে এক নিছক বিশ্বাসঘাতকতা। ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য শিক্ষা হলো—বিপ্লবী পরিবর্তন কেবল জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ ও সঠিক কাঠামোর মাধ্যমেই টিকে থাকতে পারে।
সুফি সাগর সামস্, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


