বিজ্ঞান ডেস্ক

মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় বস্তু হলো ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে মহাকর্ষ এত প্রবল যে কোনো বস্তু—গ্যাস, ধূলিকণা, নক্ষত্র, এমনকি আলো—ও একবার ঢুকে গেলে আর বের হতে পারে না। কৃষ্ণগহ্বরকে সরাসরি চোখে দেখা যায় না। এর রহস্যময় প্রকৃতির ওপর বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং মন্তব্য করেছিলেন, ব্ল্যাকহোল ভর এবং ঘূর্ণন ছাড়া কোনো তথ্য মনে রাখে না।
১. কৃষ্ণগহ্বরের শ্রেণীবিভাগ (ভরের ভিত্তিতে)
বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণগহ্বরকে ভরের ভিত্তিতে চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছেন:
-
স্টেলার-মাস ব্ল্যাকহোল (নক্ষত্রীয় ভরের কৃষ্ণগহ্বর)
-
একটি বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যুর পর তৈরি হয়।
-
নক্ষত্রের কেন্দ্রে মহাকর্ষীয় সংকোচন ঘটে এবং বাইরের অংশ সুপারনোভা বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়ে।
-
অবশিষ্ট কেন্দ্র যদি সূর্যের ভরের ≈৩ গুণের বেশি হয়, তা স্টেলার-মাস ব্ল্যাকহোল সৃষ্টি করে।
-
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কোটি কোটি স্টেলার-মাস ব্ল্যাকহোল থাকতে পারে।
-
-
সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল
-
বিশাল ভরের, প্রায় লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি সূর্যের সমান ভরধারী।
-
সাধারণত গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে।
-
উদাহরণ: স্যাজিটেরিয়াস এ*, আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোল।
-
এর উৎপত্তি ছোট ব্ল্যাকহোলের ধীরে ধীরে গ্যাস, ধূলিকণা ও নক্ষত্র গ্রাস, অথবা দুটি গ্যালাক্সির সংযুক্তির মাধ্যমে হতে পারে।
-
-
ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাকহোল (মধ্যম ভরের ব্ল্যাকহোল)
-
সূর্যের ৫০ থেকে ৫০,০০০ গুণ পর্যন্ত ভরধারী।
-
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরল, তবে সম্প্রতি কিছু পর্যবেক্ষণে সম্ভাবনার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
-
-
মাইক্রো বা মিনি ব্ল্যাকহোল
-
ভর অত্যন্ত কম, গ্রহ বা ইলেকট্রনের চেয়ে কম হতে পারে।
-
তাত্ত্বিকভাবে হকিং রেডিয়েশনের কারণে দ্রুত বাষ্পীভূত হতে পারে।
-
এখনও বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
-
২. কৃষ্ণগহ্বরের ভৌত বৈশিষ্ট্য
ব্ল্যাকহোলের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা যায় মোট ভর, বৈদ্যুতিক চার্জ, এবং ঘূর্ণন গতি দ্বারা। এর ভিত্তিতে তারা চার ধরনের হতে পারে:
-
শোয়ার্জশিল্ড ব্ল্যাকহোল – ঘূর্ণনশীল নয়, বৈদ্যুতিক চার্জ নেই।
-
কের ব্ল্যাকহোল – ঘূর্ণনশীল, বৈদ্যুতিক চার্জ নেই।
-
রাইসনার-নর্ডস্ট্রম ব্ল্যাকহোল – ঘূর্ণনশীল নয়, বৈদ্যুতিক চার্জ আছে।
-
কের-নিউম্যান ব্ল্যাকহোল – ঘূর্ণনশীল এবং বৈদ্যুতিক চার্জ আছে।
প্রকৃত মহাবিশ্বে কের ব্ল্যাকহোল, অর্থাৎ ঘূর্ণনশীল কিন্তু চার্জহীন ব্ল্যাকহোল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অন্যান্য ধরণের ব্ল্যাকহোল বিরল।
কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু। এরা শুধুমাত্র বিশাল ভরের বস্তু নয়, বরং মহাকর্ষের চরম সীমা এবং সময়–স্থান সম্পর্কের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ভরের ভিত্তিতে, বিশেষত স্টেলার-মাস থেকে সুপারম্যাসিভ পর্যন্ত, ব্ল্যাকহোলের বৈচিত্র্য মহাবিশ্বের গঠন ও ইতিহাস বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদিও অনেক রহস্য এখনও অমোচ্য, বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।


