অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ক্ষমতা ও প্রভাব বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি যে ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুসংহত করে রেখেছিলেন, তা এখন অভ্যন্তরীণ গণঅসন্তোষ, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপের সমন্বিত আঘাতে নড়বড়ে হয়ে উঠেছে।
খামেনির ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এই অভিজাত সামরিক বাহিনী শুধু ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচিই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং তেল-গ্যাস, নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ ও ব্যাংকিংসহ দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ তাদের দখলে। বিনিময়ে আইআরজিসি দেশের ভেতরে ও বাইরে খামেনির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষায় নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে এসেছে।
বিশেষ করে আইআরজিসির কুদস ফোর্সের মাধ্যমে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি ও ইরাক-সিরিয়ার মিলিশিয়াদের নিয়ে গড়ে তোলা তথাকথিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে সেই প্রভাব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অভ্যন্তরীণভাবে খামেনির শাসন অতীতেও একাধিক বড় সংকট মোকাবিলা করেছে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গণআন্দোলন, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে বিক্ষোভ, এমনকি ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নারী নেতৃত্বাধীন আন্দোলন—সবকিছুই কঠোর দমননীতির মাধ্যমে সামাল দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।
বর্তমানে ইরানে চলমান বিক্ষোভ শুধু নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। সরকার সামাজিক বিধিনিষেধ আংশিক শিথিল করে এবং দমন-পীড়নের মাত্রা কখনো কমিয়ে ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থানও আগের তুলনায় অনেক দুর্বল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের কৌশলগত পাল্টা অবস্থানের ফলে হামাস ও হিজবুল্লাহ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশেষ করে লেবাননে পেজার ও ওয়াকি-টকি বিস্ফোরণের মতো ঘটনায় হিজবুল্লাহর সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
পরিস্থিতি আরও নাটকীয় রূপ নেয় ২০২৫ সালের জুনে, যখন ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি বিমান হামলা চালায়। যদিও পরে মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি, তবুও এটি তেহরানের জন্য এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা দল ইরান ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের যেকোনো পাল্টা পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন মাত্রায় আঘাত হানবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ওয়াশিংটনে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে সীমিত বা পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে।
তবে এসব সংকটের মধ্যেও খামেনির প্রশাসন দাবি করছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, খামেনির সমর্থনে দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ গণমিছিল করেছে। সরকারপক্ষ বলছে, এসব মিছিল প্রমাণ করে যে এখনো একটি বড় অংশের জনগণ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আস্থা রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্ন এখন আর খামেনির শাসন টিকে থাকবে কি না—বরং কতটা শক্তি ও কতটা ছাড় দিয়ে তা টিকে থাকবে। অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, আঞ্চলিক প্রভাবের ক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক চাপ—এই তিনমুখী সংকটের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসা খামেনির জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।


