অনলাইন ডেস্ক

ধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার ছায়া নেমেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর মৃত্যুর খবরে। তেহরান থেকে বৈরুত, গাজা থেকে সানআ—ইরান-সমর্থিত জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ একযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, খামেনির অনুপস্থিতি শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণেই পরিবর্তন আনবে না; বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ হলো ইরান-নেতৃত্বাধীন এক অপ্রাতিষ্ঠানিক জোট, যেখানে লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাক ও ইয়েমেনের একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী যুক্ত। এই নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানে রয়েছে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
এই জোটের মূল শক্তি সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহায়তা—যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেহরান।
লেবাননে প্রস্তুত হিজবুল্লাহ
লেবাননের শিয়া সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ‘মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন’ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সরাসরি হিজবুল্লাহর সামরিক পুনর্গঠন ও সমন্বয় তদারকি শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে উত্তেজনা বাড়লে ইসরায়েলের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গাজায় হামাসের কড়া বার্তা
ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এই হত্যাকাণ্ডকে ‘জঘন্য অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে দায়ী করেছে।
হামাস নেতাদের ভাষ্য, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করেছে এবং এর পরিণাম হবে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’। গাজা উপত্যকায় নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
ইয়েমেনে হুথিদের যুদ্ধের ইঙ্গিত
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি আন্দোলন-এর নেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি সরাসরি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষায়’ তারা যেকোনো স্তরের সংঘাতে প্রস্তুত। লোহিত সাগরে পশ্চিমা জাহাজে হামলা আরও জোরদারের হুমকিও দেওয়া হয়েছে—যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরাকে শিয়া মিলিশিয়াদের হুঁশিয়ারি
ইরাকভিত্তিক শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কাতায়িব হিজবুল্লাহ ‘টোটাল ওয়ার’ বা সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলেছে।
তাদের বক্তব্য, ইরানের ওপর এই আঘাতের ফল পুরো অঞ্চলকেই যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মার্কিন ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে—এমন উদ্বেগও রয়েছে।
উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা: কার হাতে যাবে ক্ষমতা?
খামেনির মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে হবেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা? সম্ভাব্য তালিকায় আলোচনায় আছেন তাঁর পুত্র মোজতাবা খামেনি এবং সাবেক আইআরজিসি কর্মকর্তা ও রাজনীতিক আলি লারিজানি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরসূরি নির্ধারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও সামরিক কাঠামোর ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি আইআরজিসির প্রভাব বাড়ে, তবে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি আরও আক্রমণাত্মক হতে পারে।
সামনে কী?
খামেনির প্রয়াণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
-
ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি
-
গাজায় নতুন সামরিক উত্তেজনা
-
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক নৌপথে হামলার আশঙ্কা
-
ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণের সম্ভাবনা
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার না হলে, এই উত্তেজনা দ্রুত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও পড়বে।










