অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ঘিরে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ইউরোপ থেকে এলো একটি স্পষ্ট বার্তা—ইরানে হামলার জন্য নিজেদের কোনো সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না স্পেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু কূটনৈতিক অবস্থান নয়; এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা-রাজনীতিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ মোড়।
স্পেনের রোটা ও মোরন ঘাঁটি থেকে অন্তত ১৫টি মার্কিন যুদ্ধবিমান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, বিষয়টি কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন—জাতিসংঘ সনদ কিংবা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে কোনো সামরিক অভিযানে স্পেনের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। যুদ্ধবিমানগুলো শেষ পর্যন্ত জার্মানির রামস্টেইন বিমানঘাঁটি-তে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ স্পেনের এই সিদ্ধান্ত?
প্রথমত, স্পেন ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও অন্ধ সমর্থনের পথে হাঁটেনি। এর মাধ্যমে তারা দেখিয়েছে—মিত্রতা মানেই সব সিদ্ধান্তে সমর্থন নয়। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি আনুগত্যকে তারা অগ্রাধিকার দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপের ভেতরেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে—এ বার্তাও স্পষ্ট হলো। জার্মানি যুদ্ধবিমান গ্রহণ করলেও স্পেন নিজস্ব অবস্থান নিয়েছে। ফলে ইউরোপ একক কণ্ঠে কথা বলছে—এমন ধারণা দুর্বল হলো।
তৃতীয়ত, এটি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইউরোপের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমিয়েছে। কারণ স্পেনের ভূখণ্ড থেকে হামলা হলে ইরানের পাল্টা হুমকি ইউরোপীয় মাটিতেও বিস্তৃত হতে পারত।
ইরানের কড়া বার্তা: প্রতিরোধ নাকি প্রতিশোধ?
এদিকে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে—তাদের শত্রুরা কোথাও নিরাপদ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-এর বরাতে জানানো হয়েছে, শীর্ষ নেতাদের ক্ষয়ক্ষতি ইরানকে দুর্বল করেনি; বরং আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে।
এই ভাষ্য কেবল আবেগঘন প্রতিক্রিয়া নয়; এটি কৌশলগত বার্তাও। ইরান বোঝাতে চাইছে—সামরিক চাপ বাড়ালে তারা ভৌগোলিক সীমানা বিবেচনা করবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা—সব জায়গায় প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
স্পেনের অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতিকে সামনে আনে—রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষামূলক বৈধতা। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে বলপ্রয়োগ বা হুমকির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, ব্যতিক্রম কেবল আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন। স্পেন সম্ভবত এই নীতির সুরক্ষায় নিজেদের দূরে রাখছে।
ইউরোপের সামনে তিনটি পথ
১. কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা – সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এড়িয়ে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো।
২. যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অভিযানে অংশ নেওয়া – যা ইউরোপকে সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
৩. মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নেওয়া – সংঘাত কমাতে রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ।
স্পেনের পদক্ষেপ তৃতীয় পথের সম্ভাবনাকেই জোরালো করে।
উপসংহার: আগুনের মাঝে সংযমের রাজনীতি
বর্তমান বাস্তবতায় স্পেনের সিদ্ধান্তকে কেবল ‘না’ বলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এক ধরনের কৌশলগত সংযম—যা দেখায়, সামরিক জোটের ভেতর থেকেও স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যখন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, তখন ইউরোপের এই সংযম কি নতুন ভারসাম্যের সূচনা করবে, নাকি জোট রাজনীতিতে নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে—তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত স্পেন দেখিয়ে দিল, যুদ্ধের প্রান্তে দাঁড়িয়েও সংযম এক ধরনের শক্তি।


