অনলাইন ডেস্ক

হলিউডের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়েছে নির্মাতা রায়ান কুগলারের আলোচিত সিনেমা ‘সিনার্স’। অস্কারের ৯৭তম আসরে রেকর্ড ১৬টি মনোনয়ন পেয়ে ছবিটি ইতোমধ্যেই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। গত বছর মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে ঝড় তোলা এই সিনেমাটি কেন সমালোচকদের চোখে বছরের সেরা—তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
অথচ নির্মাণের শুরুতে এই প্রকল্পকে ঘিরে ছিল চরম সংশয়। মাত্র দুই মাসে লেখা চিত্রনাট্য ও ১০ কোটি ডলারের বাজেট নিয়ে কাজ শুরু করায় অনেকেই একে স্টুডিওর জন্য ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে ‘সিনার্স’ এখন শিল্প ও বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই অনন্য উচ্চতায়।
জিম ক্রো যুগে ভ্যাম্পায়ারের গল্প
১৯৩০-এর দশকের জিম ক্রো যুগের দক্ষিণ আমেরিকা—এই পটভূমিতে নির্মিত ছবিটি শুধু একটি ভ্যাম্পায়ার হরর নয়, বরং গভীর গবেষণালব্ধ এক ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ।
ছবিতে উঠে এসেছে—
-
মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা
-
দাসপ্রথা-পরবর্তী কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি
-
ব্লুজ সংগীতের শিকড় ও বিবর্তন
আইম্যাক্স ৭০ এমএম ফরম্যাটে ধারণ করা এই চলচ্চিত্রে কুগলার এমন এক সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সামনে এনেছেন, যখন এসব বিষয় রাজনৈতিকভাবে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে।
বিশেষ করে ছবির জুক-জয়েন্টের দৃশ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং মার্কিন সংগীত ইতিহাস নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূচনা করেছে।
দ্বৈত চরিত্রে মাইকেল বি. জর্ডানের অনবদ্য অভিনয়
ছবির সাফল্যের অন্যতম বড় কারিগর মাইকেল বি. জর্ডান। তিনি এতে যমজ ভাই স্মোক ও স্ট্যাক চরিত্রে দ্বৈত অভিনয় করেছেন।
সমালোচকদের মতে—
-
শারীরিক ভাষার সূক্ষ্ম পার্থক্য
-
কণ্ঠের নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন
-
মানসিক টানাপোড়েনের নিখুঁত প্রকাশ
এই তিনটি দিকই তাঁর অভিনয়কে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
পাশাপাশি—
-
হেইলি স্টেইনফেল্ড
-
ডেলরয় লিন্ডো
ছবিতে এনে দিয়েছেন আবেগী গভীরতা। আর প্রচলিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উনমি মোসাকুর উপস্থিতি হলিউডের দীর্ঘদিনের ছাঁচে ঢালা রীতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কারিগরি নৈপুণ্যে জীবন্ত ১৯৩০-এর দশক
পর্দার পেছনের দুই গুরুত্বপূর্ণ কারিগর—
-
কস্টিউম ডিজাইনার রুথ ই. কার্টার
-
সেট ডেকোরেটর মনিক শ্যাম্পেন
তাঁদের যৌথ প্রয়াসে ১৯৩০-এর দশকের দক্ষিণ আমেরিকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ হয়ে উঠেছে প্রায় জীবন্ত।
সমালোচকদের মতে, সেট ও পোশাক শুধু দৃশ্যপট নয়, গল্প বলার অংশ হয়ে উঠেছে।
বক্স অফিস ও মৌলিক গল্পের বিজয়
বক্স অফিসে ছবিটির আয় দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে ‘সিনার্স’ হয়ে উঠেছে—
গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল মৌলিক চলচ্চিত্র।
কোনো নামী ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়,
কোনো পরিচিত গল্পের রিমেক নয়—
সম্পূর্ণ নতুন গল্প বলেই এই সাফল্য।
ছবিটি একই সঙ্গে—
-
হরর
-
মিউজিক্যাল
-
গ্যাংস্টার থ্রিলার
-
ঐতিহাসিক ড্রামা
এই চারটি ধারার অনন্য মিশ্রণ।
পরিচালক রায়ান কুগলার একে তাঁর প্রয়াত মামার প্রতি একটি ‘ভালোবাসার চিঠি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
শিল্পীসত্তা ও শেকড়ের গল্পের জয়
প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়া এবং অস্কারে এই বিশাল স্বীকৃতি প্রমাণ করছে—
সৃজনশীল স্বাধীনতা ও শেকড়ের গল্প আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে সমাদৃত হতে পারে।
‘সিনার্স’ শুধু একটি সফল সিনেমা নয়—
এটি এখন সমকালীন হলিউডে মৌলিক গল্প বলার এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


