স্টাফ রিপোর্ট | ঢাকা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে গত নভেম্বর মাসের পরিসংখ্যান প্রকাশের পর। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও টকশো উপস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেছেন, কেবল নভেম্বর মাসের কয়েকটি খবরে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দেশের আজকের বাস্তবতা কতটা সহিংস, অনিরাপদ ও অস্থির। নির্বাচনের আগে যে সহিংসতার ঢেউ চলছে, সেটিকে সাধারণ নির্বাচনী উত্তাপ বলা হবে বাস্তবতাকে আড়াল করার “খুবই সুবিধাজনক চেষ্টা”।
রাজনৈতিক সহিংসতায় এক মাসে ১২ জন নিহত
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস–এর পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান—
-
নভেম্বর মাসে অন্তত ৯৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
-
এই সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১২ জন
-
আহত ৮৭৪ জন, যাদের অনেকে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
এই সংখ্যাগুলোই জানান দেয়, নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা: মৃত্যু ১৬ জনের
এই সময়রেখায় আরেকটি আশঙ্কাজনক প্রবণতা হলো গণপিটুনি ও মব সহিংসতার উল্লম্ফন।
-
২০টি ঘটনায় ১৬ জন নিহত
-
একই ঘটনায় আহত আরও বহু মানুষ
সমাজে আইনের শাসনের প্রতি অনাস্থা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও শাস্তির অনুপস্থিতিই এই প্রবণতাকে দীর্ঘদিন ধরে উসকে দিয়ে আসছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
নারী ও শিশু নির্যাতন: পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক
জিল্লুর রহমানের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি যে পরিসংখ্যান আরও বেশি শিহরিত করে, তা হলো নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের বৃদ্ধি।
-
১৭৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার
-
অন্তত ৪৮ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের মধ্যে বহু শিশু ও কিশোরী
এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকায় সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে।
‘দ্বিতীয় স্বাধীনতার দরজা’—ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আশা ও বাস্তবতার ফারাক
অগাস্টে বিস্ফোরিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দেশের বহু মানুষের মনে একপ্রকার আশার সঞ্চার করেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন—
-
রাষ্ট্র এবার হয়তো নাগরিকের হাতে ফিরে আসবে
-
রাজনীতি ফিরে যাবে মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার পথে
-
সহিংসতা কমে যাবে, মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হবে
কিন্তু নভেম্বরের পরিসংখ্যান—জিল্লুর রহমানের ভাষায়—এই আশাগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
নির্বাচন ঘিরে উত্তাপ নয়, এটি কাঠামোগত সংকট
জিল্লুর রহমান তার সাম্প্রতিক ইউটিউব ভিডিওতে বলেন—
“এগুলোকে শুধু নির্বাচনী উত্তাপ বলা হলে সেটা হবে বাস্তবতাকে আড়াল করার সুবিধাজনক চেষ্টা। নভেম্বরের ঘটনাগুলো দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সংকট এখন আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গভীর কাঠামোগত ও রাষ্ট্রীয় সংকট।”
তার মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার সংঘাত ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মন্তব্য
বিক্ষুব্ধ নভেম্বরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন—
-
সহিংসতা এভাবে বাড়তে থাকলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে
-
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছে
-
নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা সমাজের গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত
রাষ্ট্র যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচনের আগে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে।
নভেম্বরের পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলে—
বাংলাদেশ আজ এক দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি।
একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা, দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো আর সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা। অগাস্টের অভ্যুত্থানের পর যে স্বপ্নের পুনর্জাগরণের কথা ভাবা হয়েছিল, বাস্তবতা তার পুরো উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশ কি এই সহিংসতার চক্র ভেঙে নাগরিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারবে?—এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড়।


