সুফি সাগর সামস

বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের সংঘাতমুখী রাজনীতি, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে প্রতিশোধের সংস্কৃতি, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্যহীনতার পর রাষ্ট্র এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের নীতি, বক্তব্য এবং কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটছে কি না-সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিশোধমূলক পুনর্বিন্যাস প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতিটি নির্বাচন এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াইয়ে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু কেবল ভাষার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রকৃত পরিবর্তনের পরিমাপ হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের পেশাদারিত্ব এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতার মাধ্যমে। যদি এসব ক্ষেত্রে বাস্তব সংস্কার দৃশ্যমান হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। অন্যথায় ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ কেবল নতুন ভাষায় পুরোনো বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি হিসেবেই বিবেচিত হবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত-এসবই আগামী কয়েক বছরের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নির্ধারক। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা না গেলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কঠিন হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্র্নিধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক, আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি করিডর এবং সরবরাহ শৃঙ্খল-এসব প্রশ্ন এখন আর কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি নির্ভরশীলতা নয়’-অর্থাৎ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াবে, অন্যদিকে তেমনি কোনো একক শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে অনাবশ্যকভাবে জড়িয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল অবকাঠামো, পরিবেশ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার হাতিয়ার নয়, বরং তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ কল্যাণব্যবস্থায় রূপান্তর করাও সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই রাজনৈতিক নয়; প্রাতিষ্ঠানিক। বাংলাদেশ কি ব্যক্তি-নির্ভর রাষ্ট্র থেকে প্রতিষ্ঠান-নির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারবে? যদি পারে, তবে বর্তমান সময়কে ইতিহাস একটি রূপান্তরের সূচনা হিসেবে মূল্যায়ন করবে। আর যদি পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতি নতুন ভাষায় ফিরে আসে, তবে এই পরিবর্তনও অতীতের বহু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মতোই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকবে।
অতএব, বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধী দলকে পরাজিত করা নয়; বরং নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠন, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশকে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও কৌশলগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলে এটি কেবল একটি সরকারের সাফল্য হবে না; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
সুফি সাগর সামস
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি


