অনলাইন ডেস্ক

রাশিয়া ও ভারত বহু দশক ধরে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। ২০২২ সালের পর ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই অবস্থায়ই, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন দুই দিনের সফরে (নভেম্বর–ডিসেম্বর ২০২৫) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আসছেন। সফরের মূল উদ্দেশ্য — অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, শক্তি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন দিগন্ত खুঁজে বের করা।
শক্তি ও অর্থনীতি: রাশিয়া–রফতানি তেল এবং বাণিজ্য
-
যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলেও ভারত এখনও রাশিয়া থেকে দ্রুত, কম দামে তেল আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে।
-
২০২৪ সালে, রাশিয়া ভারতীয় তেলের আমদানিতে প্রায় ৩৭.৩% ভাগ দখল করে — যা যুদ্ধের আগে তুলনায় বিশাল বৃদ্ধি।
-
এই পরিবর্তন শুধু তেল নয় — বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও তেজী করার পরিকল্পনা চলছে। বিশেষ করে, মুদ্রা লেনদেনে রুপি–রুবল ব্যবহারের সহজীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
-
আগামী দিনগুলোতে বাণিজ্যিক চুক্তি, রপ্তানি বৃদ্ধির (কৃষি, ঔষধ, টেক্সটাইল), এবং রাশিয়ার মার্কেটে ভারতীয় পণ্য প্রবেশ — এসবই আলোচনা-কেন্দ্রে।
প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারি
-
রাশিয়া দীর্ঘ সময় ধরেই ভারতের বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী।
-
পুতিন–মোদি বৈঠকে সম্ভবত পুরনো চুক্তির ত্বরণ, নতুন রক্ষা বস্তু (যেমন উন্নত সিস্টেম বা ফাইটার জেট), এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর (military-tech transfer) নিয়ে আলোচনা হবে। Tribune+2
-
তবে, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার ফলে সরবরাহ চেইনে জটিলতা রয়েছে — ফলে ভারত হয়তো বিকল্প উৎসের দিকে তাকাচ্ছে, যদিও রাশিয়া থেকে সরবরাহ বন্ধ করাও পুরোপুরি সম্ভব নয়।
মোদি–মস্কো বনাম ট্রাম্প প্রশাসন: যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
-
২০২৫ সালের মধ্যেই, ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে।
-
ট্রাম্প ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যে শুল্ক দ্বিগুণ (৫০%) করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা রুশ তেল কেনার কারণে।
-
তবে, রাশিয়া ও ভারত উভয়েই বলেছে — ভারতের এ ধরণের সিদ্ধান্ত স্বাধীন, এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে ন্যায্য মনে করে না।
-
এ অবস্থায়, পুতিনের এই সফরকে বিশ্লেষকরা বলেন — এটি হল নয়াদিল্লির “কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার” প্রচেষ্টা।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
-
রাশিয়া প্রমাণ করতে চায় যে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মস্কোর জন্য বড় বাজার ও অংশীদারি রয়েছে — আর ২০২৫ সালের পুতিন–মোদির এ বৈঠক সেই মেসেজকে শক্তিশালী করবে।
-
অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র, এই পুনরায় ঘনিষ্ঠতার দিকে সতর্ক চোখ রাখছে। কারণ, রাশিয়ার অর্থ ও প্রতিরক্ষা শক্তি ফিরে আসলে ইউক্রেন ও গ্লোবাল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে।
-
ভারত নিজেকে একটি “স্বাধীন কূটনৈতিক পথ” অনুসরণকারী হিসেবে দেখাতে চায় — পশ্চিমা চাপ ও রাশিয়ার সাথে ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক — দুই-ই বজায় রাখার চেষ্টা।
ভ্লাদিমির পুতিনের এই সফর — শুধুই রূপালী ছবি নয়; এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নাট্যভূমি। রাশিয়া–ভারত সম্পর্ক শুধুই অতীতের বন্ধুত্ব নয়, এখন তা গ্লোবাল শক্তি ব্যালান্সিংয়ের অংশ। তবে, যেখানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, মার্কিন শুল্ক ও গঠনমূলক চাপ রয়েছে, সেখানে নয়াদিল্লি–মস্কো সম্পর্ক চালু রাখার সিদ্ধান্ত ভারতকেকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ভবিষ্যতে রাশিয়া–ভারত মধ্যকার এই নতুন চুক্তি ও সহযোগিতা ভারতের ভূ-রাজনীতিতে কতটা স্থায়িত্ব পায়, সেটা নির্ভর করবে — বিশ্বশক্তির সঙ্গে ভারতের “স্বাধীন কূটনীতির” কৌশল কীভাবে কাজ করে।


