
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যে এক প্রকার আধুনিক দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ—তা আজ আর কেবল তাত্ত্বিক অভিযোগ নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। ‘চাকর’ শব্দ থেকে ‘চাকরি’—শব্দটির উৎপত্তি যেমন দাসত্বের ইতিহাস বহন করে, তেমনি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাও আজও সেই দাসত্বের কাঠামো বহন করছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার প্রায় ১৯০ বছর ভারতবর্ষ শাসন ও শোষণ করেছিল। ১৯৪৭ সালে রাজনৈতিকভাবে সেই শাসনের অবসান ঘটলেও শোষণের পদ্ধতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। কেবল শাসকের পরিচয় বদলেছে। আগে শোষণ করত বিদেশি শাসক, এখন শোষণ করে দেশীয় বিত্তশালী শ্রেণি। ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অধরা রয়ে গেছে।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জনগণ এই ভূখণ্ডের প্রকৃত মালিকানা অর্জন করেছিল। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সেই মালিকানা কার্যত জনগণের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে জনগণ কাগজে-কলমে মালিক হলেও বাস্তবে ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে রেখেছে একটি ক্ষুদ্র বিত্তশালী গোষ্ঠী।
স্বাধীনতার পর ন্যায্য ও যৌক্তিক ছিল—সমগ্র ভূমিসম্পদ জনগণের মধ্যে সমান হারে বণ্টন করা। যদি তা করা হতো, তাহলে চার সদস্যের প্রতিটি পরিবার গড়ে দুই একর জমির মালিক হতে পারত। এই ভূমিকে ভিত্তি করে কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবীরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেত। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার বিপরীত। ব্রিটিশ আমলের জমিদারি, পুঁজিপতিদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিত্তশালীদের ব্যবসা-সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের প্রায় ৯০ ভাগ কৃষক-শ্রমিক বিত্তশালী পরিবারের গোলামে পরিণত হয়েছে।
এই গোলামির ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। ধনী-গরিবের বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। বিত্তশালীরা রাজনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে বগলদাবা করে এমপি-মন্ত্রী হয়ে জনগণের রক্ত-ঘামঝরা শ্রমের অর্থ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করছে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীন পরিবারের যুবকদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় গিয়ে নিজের শ্রেণির স্বার্থই রক্ষা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শ্রম আইন ছিল শোষণের প্রধান হাতিয়ার। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর এসব আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র জনগণকে শোষণ অব্যাহত রাখার স্বার্থেই সেই আইন বহাল রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ আইন দিয়ে কৃষক-শ্রমিকের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়—এটি ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রচলিত শ্রম আইন আমূল সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় এই দাসত্ব চলতেই থাকবে বংশপরম্পরায়—মালিকের সন্তান মালিক হবে, আর দাসের সন্তান দাসই থেকে যাবে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও যদি এই কাঠামোগত শোষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তবে নতুন সরকারও ব্যতিক্রম হবে না।
শ্রমিক শোষিত হতে থাকবে ততদিন, যতদিন তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হবে এবং সংগঠিত না হবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া যেমন মুক্তি অসম্পূর্ণ, তেমনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া স্বাধীনতা অর্থহীন।
আজ সময় এসেছে সাহসী সংস্কারের—ভূমি সংস্কার, শ্রম আইন সংস্কার এবং শোষণতান্ত্রিক শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙার। দাসত্বের শেকল ভাঙার লড়াই এখনও অসম্পূর্ণ। এই লড়াই সম্পন্ন করাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


