
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখন সবচেয়ে বেশি—এই বাস্তবতা শুধু পরিসংখ্যানগত নয়, এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশের তালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার পূর্বাভাস থাকলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে নামছে না—এটাই মূল উদ্বেগের বিষয়।
অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি একটি সামষ্টিক সূচক হলেও বাস্তবে এটি সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে। গত তিন বছর ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি কার্যত মানুষের সঞ্চয় ভেঙে দিয়েছে, জীবনযাত্রার মান নামিয়ে এনেছে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে—ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, যা এক ধরনের নীরব দারিদ্র্য সৃষ্টি করছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতি। সরকারি পরিসংখ্যানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত থাকলেও বাজার বাস্তবতায় তার প্রতিফলন খুব সীমিত। চাল, ডাল, তেল, সবজি কিংবা প্রোটিনজাত খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। খাদ্য খাতের এই অস্থিরতা সরাসরি পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য আরও ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোসহ মুদ্রানীতির কড়াকড়ি করেছে, সরকারও শুল্ক-কর ছাড় ও আমদানিনির্ভর বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো—এসব পদক্ষেপ এখনো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশই সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট ও কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে জড়িত, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে যার সমাধান সম্ভব নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। কয়েক বছর আগেও শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা গেলেও তারা কঠোর ও সমন্বিত নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। সেখানে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার তদারকি—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করেছে। বাংলাদেশে এখনো সেই সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব। পাইকারি ও মধ্যস্বত্বভোগী পর্যায়ে মনোপলি ভাঙা যায়নি। কৃষক ন্যায্য দাম না পেলেও ভোক্তাকে উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে—এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, সমস্যার মূল রয়েছে সরবরাহ চেইনের ভেতরে। খাদ্য আমদানিতে শুল্ক কমানো একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী না করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ টেকসই হবে না।
২০২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কিছু বেশি হতে পারে বলে জাতিসংঘ পূর্বাভাস দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রবৃদ্ধির সুফল কে পাচ্ছে? যদি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ভারসাম্য না থাকে, তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটবে না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজন। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে না আনতে পারলে সামাজিক অসন্তোষ বাড়বে, দারিদ্র্য হ্রাসের অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সময় এসেছে খণ্ডিত নয়, বরং সমন্বিত ও সাহসী নীতি সিদ্ধান্তের।
মূল প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি কেবল পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার অপেক্ষায় থাকবে, নাকি বাস্তবে মানুষের বাজারের বোঝা হালকা করার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে অর্থনীতির প্রকৃত গতিপথ।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


