অনলাইন ডেস্ক

তেহরানের আকাশে এখন শুধু বারুদের গন্ধ নয়, ঘনীভূত হচ্ছে গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মেঘ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই দিক থেকেই ক্রমবর্ধমান চাপে পড়েছে বলে দাবি করছে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা। দ্য আটলান্টিক–এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক কৌশলগত ব্যর্থতা ও মিত্র হারানোর মধ্য দিয়ে খামেনি কার্যত একাকী হয়ে পড়েছেন।
নিবন্ধ অনুযায়ী, এই পতনের সূচনা ঘটে প্রায় এক বছর আগে, যখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তেহরান। এর পর থেকেই ইসরায়েলি হামলায় একে একে দুর্বল হয়ে পড়ে ইরান-সমর্থিত তথাকথিত ‘অক্ষশক্তি’ বা রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট। লেবাননের হিজবুল্লাহকে কার্যত নিরস্ত্রীকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা থেকে আসা বড় ধাক্কা
খামেনির জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় মানসিক ও কৌশলগত আঘাত এসেছে সুদূর ভেনেজুয়েলা থেকে। দীর্ঘদিনের মিত্র প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রে একটি আদালতে বন্দি হিসেবে হাজির হওয়ার খবরে তেহরানের ক্ষমতাকেন্দ্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। মার্কিন প্রশাসন এই অভিযানের সাফল্যকে ইরানের বিরুদ্ধে গত বছরের সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করে যে বার্তা দিয়েছে, তা তেহরানের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
১২ দিনের যুদ্ধ ও বিপরীত দাবি
গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর তেহরান নিজেদের বিজয়ী দাবি করলেও পশ্চিমা দেশগুলোর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, এই সংঘর্ষ ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও জনরোষ
একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। চরম অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলছে। পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, এসব আন্দোলন খামেনির শাসনের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। যদিও তেহরান সরকার বলছে, তারা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না এবং সব ধরনের হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুত।
রাশিয়া-চীনের নীরবতা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটে ইরানের জন্য সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো রাশিয়া ও চীনের কার্যত নীরব ভূমিকা। বিশ্বরাজনীতির প্রভাবশালী এই দুই শক্তির নির্লিপ্ততা ইরানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এর ফলে দেশটির কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, টিকে থাকতে হলে কেবল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে।
বিরোধী কণ্ঠ ও পাহলভির উত্থান
অন্যদিকে, ইরানের পশ্চিমপন্থি ও তথাকথিত উদারপন্থী মহল সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের দাবি, শাসনের বৈধতা আসতে হবে জনগণের ভোট থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খামেনিবিরোধী ইরানিদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও হাস্যরসেও সেই ক্ষোভ স্পষ্ট।
এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় উঠে এসেছেন নির্বাসিত প্রিন্স রেজা পাহলভি। তিনি নিজেকে ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং রাজপথের কিছু বিক্ষোভে তার পক্ষে স্লোগান শোনা যাচ্ছে। যদিও পাহলভি সরাসরি সামরিক হামলার পক্ষে নন, তবে তার ঘনিষ্ঠ মহল মার্কিন ও ইসরায়েলি তৎপরতাকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যুক্তরাষ্ট্র কি আদৌ পাহলভিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়? ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সেখানে ক্ষমতা বিরোধী জোটের বদলে মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে। ভয়েস অব আমেরিকার ফার্সি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা—ইরানের বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে। ফলে বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধান সম্ভবত ইরানের ভেতরেই চলছে।
তেহরানের অভিযোগ ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর
ইরানের বর্তমান প্রশাসন এই বিক্ষোভের জন্য সরাসরি বিদেশি উসকানিকে দায়ী করছে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করতে প্রস্তুত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির জন্য বড় হুমকি বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—এই বহুমুখী চাপের মুখে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা কতটা টিকে থাকতে পারবে, নাকি দেশটি এক ঐতিহাসিক মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
সূত্র: দ্য আটলান্টিক, প্রেস টিভি, মেহের নিউজ


