সুফি সাগর সামস্

সদ্য শেষ হওয়া ইংরেজি বছরের ডিসেম্বর মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অত্যন্ত ব্যতিক্রমী সময় হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিনটি নজিরবিহীন ঘটনা, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।
প্রথম ঘটনা ছিল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় এবং ২০ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জনতার বিপুল উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর, দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যেই পূর্বাচলের ৩০০ ফিট রাস্তার ওপর অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন। আর বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন, দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে।
এই এক মাসের ঘটনাবাহিনী রাজনৈতিক চিত্রকে এমনভাবে পরিবর্তন করেছে, যা দীর্ঘ সময় ধরেই বাংলাদেশে দেখা যায়নি। নির্বাচনের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিবেশে, যেখানে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করছে, সেখানে ছোট দলগুলো যেমন এনসিপি, বিভিন্ন ইসলামি দল বা অন্যান্য সংখ্যালঘু দলগুলোর প্রভাব সীমিত। ফলে ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই প্রধান দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জনগণ কেন্দ্র করে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই কিছু মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি সহ অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মোট ২,৫৬৯টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে, যার মধ্যে ৭৫টি বাতিল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই নির্বাচনী প্রচারণা কার্যকর হবে।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বিএনপির পক্ষে যে জনসমর্থনের জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তা স্পষ্ট করে দেখায় যে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হতে পারে। ছোট দলগুলো, যারা এককভাবে সরকার গঠনের ক্ষমতা রাখে না, তারা ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের দাবি তুললেও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তা সম্ভবপর নয়।
ছোট দলগুলো এবং জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সঙ্গে পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের মধ্যভাগে বিএনপির কিছু নেতা জামায়াতকে আক্রমণ শুরু করেছিলেন, যা এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যায়। তবে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর বিএনপি জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠনের প্রস্তাব থেকে সম্পূর্ণ ইউ-টার্ন নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে, জাতীয় সরকারের গঠন এখন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনা নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে এককভাবে বিজয়ী দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন চাইছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শোষণ ও জুলুমের অভিজ্ঞতা অর্জন করায় তারা নতুন শক্তি ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের আশা রাখে। জামায়াতে ইসলামীও অতীতের তুলনায় জনসমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু তারা সরকার গঠনের ক্ষমতাসীন অবস্থায় পৌঁছাবে না। এই অবস্থায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সারসংক্ষেপে, ডিসেম্বর ২০২৫ কেবল বিজয় দিবসের মাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান, পুরনো রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তন, এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাবে। এই মাসের প্রভাব আগামী নির্বাচনে দৃশ্যমান হবে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করবে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


