অনলাইন ডেস্ক

গাজা যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে উভয় পক্ষের মানসিক স্বাস্থ্যে। ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে আত্মহত্যা ও পোস্ট ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) বৃদ্ধি পাচ্ছে, একই সঙ্গে গাজার বাসিন্দারাও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে সতর্ক করেছেন ফিলিস্তিনি চিকিৎসকরা।
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে চলমান নিরবচ্ছিন্ন হামলা ও যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট এই মানসিক বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবাদানকারী সংস্থাগুলো। বিশেষ করে গাজা ও লেবানন ফ্রন্টে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা কয়েক লাখ রিজার্ভ ও নিয়মিত সেনার মধ্যে মানসিক ট্রমার মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় বর্তমানে সেনাদের মধ্যে পিটিএসডির হার প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সাল নাগাদ এই হার ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমানে যুদ্ধাহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন প্রায় ২২ হাজার সেনার মধ্যে ৬০ শতাংশই কোনো না কোনো ধরনের মানসিক ট্রমায় ভুগছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে প্রায় ২৭৯ জন ইসরায়েলি সেনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। দেশটির একটি সংসদীয় কমিটির তথ্যমতে, গত এক বছরে ইসরায়েলে সংঘটিত মোট আত্মহত্যার ঘটনার ৭৮ শতাংশই ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মৃত্যুভয়, সহযোদ্ধাদের মৃত্যু এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের ওপর হামলার ফলে সৃষ্ট ‘নৈতিক ক্ষত’ (মোরাল ইনজুরি) সেনাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।
অন্যদিকে গাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা হামলা, অবরোধ এবং মৌলিক চাহিদার ঘাটতিতে প্রায় ২০ লাখ মানুষ চরম মানবিক ও মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গাজার শিশুদের মধ্যে রাতের বেলা আতঙ্কিত হয়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া, মনোযোগের অভাব, কথা কমে যাওয়া এবং আচরণগত পরিবর্তনের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। এর প্রভাব পড়েছে প্রায় প্রতিটি পরিবারে। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নিরাপদ আশ্রয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা গাজাবাসীকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে চলমান অস্থিরতার কারণে ইসরায়েলি সেনাদের ছুটি ও বিশ্রামের সুযোগ কমে গেছে, যা তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে। ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই বিপুল চাহিদা সামাল দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণভাবে অপ্রতুল। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সেনাই সময়মতো প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা পাচ্ছেন না, ফলে চরম পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে এই মানসিক স্বাস্থ্য সংকট উভয় পক্ষের জন্যই এক নতুন মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব যুদ্ধ শেষ হলেও বহু বছর ধরে টিকে থাকতে পারে।
সূত্র: আরব উইকলি


