অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র কৌশলগত প্রভাব এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। ৩ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-সহ শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হলেও যুদ্ধের আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে বড় ধরনের লজিস্টিক সংকট।
ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে টান, সেন্টকমের চাপ
মার্কিন বিমান বাহিনীর জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধের শুরুতেই সতর্ক করেছিলেন—উচ্চমাত্রার সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা সীমিত সময় পর্যন্ত টিকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে United States Central Command (সেন্টকম)-এর মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হারে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প কমান্ড অঞ্চল থেকে রসদ সরিয়ে আনতে হতে পারে—যা সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।
ইনডো-প্যাসিফিক থেকে সম্পদ সরানোর পরিকল্পনা
সংকট মোকাবিলায় হোয়াইট হাউজ United States Indo-Pacific Command (ইনডোপ্যাকম) এলাকা থেকে অস্ত্র ও সামরিক সম্পদ পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এতে তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনীর United States Navy ওহাইও-ক্লাস সাবমেরিনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা শিল্প খাত বর্তমানে সেই ব্যবহারের সমপরিমাণ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
ইরানের কৌশল: মজুদ শেষ করার লড়াই
যুদ্ধের চতুর্থ দিনে এসে দেখা যাচ্ছে, ইরান সরাসরি সামরিক জয়লাভের চেয়ে প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার খালি করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। ড্রোন ঝাঁক, ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক অস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহারে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি ইরান দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ও প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পাল্টা আঘাতের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
চীনের জন্য কৌশলগত সুযোগ?
ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প ইতোমধ্যে চাপের মুখে। এর মধ্যে ইনডো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হলে চীনের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালী ও ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’—জাপান থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রতিরক্ষা বলয়—দুর্বল হয়ে পড়লে বেইজিং আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা মহলে উদ্বেগ রয়েছে। চীনের জে-২০ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি এবং নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এ অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘায়িত যুদ্ধের আশঙ্কা
হোয়াইট হাউজ প্রাথমিকভাবে সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সীমিত থাকবে বলে ধারণা করলেও বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থল সেনা মোতায়েনের গুঞ্জন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সামরিক বিশ্লেষক ব্র্যান্ডন জে উইকার্ট মনে করেন, একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে যদি যুক্তরাষ্ট্র তার উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ ব্যয় করে ফেলে, তবে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসতে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাবের শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা স্থিতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং সামরিক জোট রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে না এগোলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে।
সূত্র: 19FortyFive


