সুফি সাগর সামস্

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ক্রমেই একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে, যেখানে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাশিয়া এবং এর নেতৃত্বে থাকা Vladimir Putin।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ডলার আয় করা কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক প্রবণতা নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক সুযোগের সদ্ব্যবহার। হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ঝুঁকি—সব মিলিয়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানো রাশিয়ার জন্য এক অভূতপূর্ব আর্থিক সুবিধা তৈরি করেছে।
কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি আয় এক মাসে দ্বিগুণ হয়ে ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে—যা প্রমাণ করে, যুদ্ধ কেবল ধ্বংস নয়, বরং কিছু রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের মাধ্যমও হতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব কি সত্যিই সংঘাত কমাতে আগ্রহী, নাকি কেউ কেউ এই অস্থিতিশীলতাকে দীর্ঘায়িত করতে চায়?
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর প্রশাসনের নীতিগত শিথিলতা। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যত দুর্বল হওয়ায় দেশটি ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির কাছে তেল বিক্রিতে নতুন বাজার পেয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি দামে তেল বিক্রির নজির তৈরি হয়েছে—যা বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রাশিয়ার বার্ষিক জ্বালানি আয় ৩৮৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে—যা বৈশ্বিক শান্তি প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ Simon Johnson যথার্থই বলেছেন, এই অতিরিক্ত আয় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাবে না; বরং এটি একটি পক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও অসম হয়ে উঠবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো—বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতি—চরম চাপের মুখে পড়বে।
ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্যও দেখায়, বিশ্ব রাজনীতিতে নীতিগত অবস্থানের চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থই এখন বড় চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় বৈশ্বিক নৈতিকতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি সরাসরি আমাদের শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলবে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী?
প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ জরুরি। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক কূটনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা। এই বাস্তবতায় যারা কৌশলী, তারাই লাভবান হচ্ছে—আর যারা নির্ভরশীল, তারা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সময় বাস্তবতা বুঝে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


