অনলাইন ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট Donald Trump যে সংঘাতের সূচনা করেছেন, তা যে কোনো সময় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের আকাশে বিস্ফোরণের পর কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয় নতুন উত্তেজনা। হোয়াইট হাউসের নির্দেশে পরিচালিত এই অভিযানে পেন্টাগন একে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়ন হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী Pete Hegseth দাবি করেছেন, অভিযানের সমাপ্তি হবে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে।
তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ বলছেন, এই আত্মবিশ্বাস ২০০১ সালে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর সময়ের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি মনে করিয়ে দেয়, যার পরিণতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ওয়াশিংটন।
খামেনির মৃত্যু ও আঞ্চলিক সমীকরণ
যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযান সফল হলে দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটতে পারে; কিন্তু ব্যর্থ হলে অঞ্চলজুড়ে অরাজকতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, রাষ্ট্রযন্ত্রে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি হলে ইরানে গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে বাস্তববাদী বিশ্লেষকদের মতে, অবশিষ্ট নেতৃত্ব নতুন শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট
CNN–এর বিশ্লেষণে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি প্রধান সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে—
-
গণঅভ্যুত্থান ও নতুন শাসনব্যবস্থা: বিমান হামলার প্রভাবে শাসন কাঠামো ভেঙে পড়ে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
-
কঠোর নেতৃত্বের পুনর্গঠন: অবশিষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্র নতুন জোট গঠন করে আগের চেয়ে আরও কট্টর অবস্থান নিতে পারে।
-
গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতা: লিবিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও শরণার্থী সংকট ডেকে আনবে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কখনো পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের কথা বলা হচ্ছে, আবার কখনো ইরানি জনগণের ‘মুক্তি’র কথা। এই অস্পষ্টতা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সামরিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে কোনো দেশে টেকসই শাসন পরিবর্তন ঘটানো ঐতিহাসিকভাবে কঠিন। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে না।
খামেনির মৃত্যুর পর এখনো এমন কোনো মধ্যপন্থী নেতৃত্ব দৃশ্যমান নয়, যার সঙ্গে ওয়াশিংটন আলোচনায় বসতে পারে। বরং ইরানের কট্টরপন্থী অংশ প্রতিশোধপরায়ণ অবস্থান নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাসিজ ও রেভল্যুশনারি গার্ডস বাহিনী এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
রাশিয়া-চীন অক্ষ ও বৈশ্বিক প্রভাব
হোয়াইট হাউসের ধারণা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হলে রাশিয়ার কাছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ কমে যেতে পারে, যা ইউক্রেন যুদ্ধে প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দামের উল্লম্ফন ঘটতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি
মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে দ্রুত সাফল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘ হলে জনমতের চাপ বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ইস্যুতে শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান একটি উচ্চঝুঁকির কৌশল। তা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে; ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই জটিল এক সংঘাতের জালে আটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পেন্টাগন আশাবাদী অবস্থান নিলেও, যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অনিশ্চিত।


