অনলাইন ডেস্ক

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে আরও সহিংস রূপ নিয়েছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরিস্তান প্রদেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জনগণকে ‘শত্রু’র ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বর্তমান সংকটকে একটি ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, বিদেশি শক্তিগুলো অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করতে চাইছে। তবে অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় থাকলে দেশকে পরাজিত করা সম্ভব নয় বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গত রবিবার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন অবমূল্যায়নে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে রিয়ালের মান প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে এবং মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছেছে প্রায় ৫০ শতাংশে।
লোরিস্তানের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে একটি সরকারি ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি ছোড়ে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। লোরিস্তানে নিহত ব্যক্তি ২১ বছর বয়সী বাসিজ ফোর্সের সদস্য আমির হোসাম খোদায়ারি ফার্দ। কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুর জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের সহিংসতা’কে দায়ী করেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি মদদপুষ্ট গোষ্ঠী দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সম্প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর নতুন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও পানি সংকট এবং তেহরানের ভয়াবহ বায়ুদূষণ জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে।
সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি ‘সংলাপ পদ্ধতি’ চালুর কথা বললেও দেশটির শীর্ষ প্রসিকিউটর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—প্রতিবাদের নামে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনি হত্যাকাণ্ডের পর ইরানে যে ব্যাপক গণবিক্ষোভ হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই স্মৃতিই নতুন করে উসকে দিচ্ছে। যদিও সরকারের দাবি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার তারা স্বীকার করে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এখন প্রধান দাবি—নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং রিয়ালের মান স্থিতিশীল করা।
সূত্র: আল জাজিরা


