অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য প্রকৃত হুমকি কে—ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট—তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষণধর্মী একটি নিবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক Joseph Massad।
মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত ওই নিবন্ধে তিনি দাবি করেছেন, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে উল্টো ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
ইরানে হামলা ঘিরে উত্তেজনা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু করে Israel ও United States। অভিযানে দুই দেশের বিমানবাহিনী যৌথভাবে অংশ নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘ধর্মীয় যুদ্ধের’ বয়ান নিয়ে সমালোচনা
নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুদ্ধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump ও তার সহযোগীরা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি “শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান রাষ্ট্র” হিসেবে তুলে ধরে অ-খ্রিস্টান বিশ্বের বিরুদ্ধে সংঘাতের বয়ান তৈরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে ইরানের ওপর হামলার আগে মার্কিন কমান্ডোদের উদ্দেশে ‘আরমাগেডন’ বা যিশুর পুনরুত্থানের মতো ধর্মীয় উপমা ব্যবহার করা হয়েছে বলে যে তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য যুদ্ধের পেছনে থাকা ভূরাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে আড়াল করার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন
এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান ও জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছে। অন্যদিকে মার্কিন বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ দাবি করছে, মূলত ইসরায়েলের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে টেনে আনা হয়েছে।
তবে জোসেফ মাসাদের মতে, ইসরায়েলকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, ইসরায়েল এই অঞ্চলে মার্কিন কৌশলেরই একটি অংশ এবং অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতির ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ হিসেবে কাজ করে।
যুদ্ধ থেকে লাভের হিসাব
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে লাভবান হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প ও জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
বিশেষ করে Lockheed Martin, Boeing এবং Raytheon-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক চুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরব দেশগুলোর নীরবতা
এই সংকটের মধ্যে আরব দেশগুলোর নীরবতাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Oman ছাড়া অন্য কোনো আরব দেশ প্রকাশ্যে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানায়নি।
এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei-এর মৃত্যু বা বেসামরিক হতাহতের ঘটনাতেও বেশিরভাগ আরব রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করেনি।
অন্যদিকে Turkey—যা NATO-এর সদস্য—ইরানের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।
মার্কিন ঘাঁটি নিয়ে প্রশ্ন
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, Jordan ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ অভিযোগ করছে যে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে। তবে একই সময়ে তারা নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে ইরানে হামলার সুযোগ দিচ্ছে।
মাসাদের মতে, এসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর সংশ্লিষ্ট সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে Iran সরাসরি কোনো আরব দেশকে আগে আক্রমণ করেনি। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক আরব রাষ্ট্র ইরানকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে Israel-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ বেছে নিয়েছে।
মাসাদের মতে, এই কৌশল শেষ পর্যন্ত আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা বা ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধানে কোনো ইতিবাচক ফল দেয়নি। বরং এতে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে প্রশ্ন
তার মতে, বর্তমান যুদ্ধ থেকে শিক্ষা না নিলে আরব বিশ্ব ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আরব দেশগুলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই


