সোহানা খান

আজ পৃথিবীর প্রায় দুইশত কোটি মানুষ মুসলমান পরিচয়ে বেঁচে থাকলেও, প্রশ্ন উঠছে—এই মুসলমানরা কি সেই ইসলাম ধারণ করে আছে, যা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রচার করেছিলেন? এক আল্লাহ, এক কুরআন, এক রাসূল, এক কিবলা—তা সত্ত্বেও কেন মুসলমানরা শত শত ফেরকা, মাযহাব, উপদলে বিভক্ত? কেন ইসলাম হয়ে উঠেছে রক্ত, ক্ষমতা, রাষ্ট্র ও বিভাজনের হাতিয়ার? কোথায় হারিয়ে গেল সেই হৃদয়-নির্ভর দীনের মৌলিক চেতনা?
রাসূলের ইসলাম: হৃদয়ের মুক্তি, আত্মার বিপ্লব !
মক্কার ধূলিধূসর সমাজে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” ঘোষণা করলেন, তা ছিল শুধু ধর্মীয় ঘোষণা নয়—এক বিপ্লবী আহ্বান। এটি ছিল:
• বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,
• দাসপ্রথার বিরুদ্ধে মানবমুক্তির ঘোষণা,
• নারীর জন্য মর্যাদা ও অধিকারের প্রতিশ্রুতি,
• এবং সর্বোপরি—আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি, নিঃস্বার্থ, প্রেমময় সংযোগের একটি আত্মিক পথ।
এই ইসলাম ছিল জীবনের গভীর অন্তঃস্থলে পরিবর্তন আনার ধর্ম—যেখানে মানুষের হৃদয় হয়ে উঠত আল্লাহর আরশের প্রতিচ্ছবি। কুরআনের ভাষা ছিল মুক্তির, করুণার, আত্মদর্শনের।
রাসূলের ইন্তিকালের পর ইসলাম দ্রুত একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিণত হয়। প্রথম চার খলিফার শাসনে কিছুটা ন্যায়পরায়ণতা বজায় থাকলেও, উমাইয়া খিলাফতের সূচনায় ইসলামের উপর রাজনীতির পায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ইসলাম আর শুধু ন্যায় ও মুক্তির দীন নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার বৈধতা দেয়ার এক উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
ইয়াজিদের উত্থান সেই ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। তিনি রাসূলেরই নাতি ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কারবালার প্রান্তরে হত্যা করে “রাজনীতির ইসলাম”-এর জন্ম দেন। সেই দিন থেকে সত্যের মুখ বন্ধ হয়, সিংহাসনের মুখে ফতোয়া উচ্চারিত হতে থাকে।
কারবালায় ২২,০০০ সৈন্য ছিল ইয়াজিদের পক্ষে—সবাই মুসলমান। তাদের অর্ধেক ছিল হাফেজ, মুফতি, ফকীহ, মুয়াজ্জিন। তারা নামাজ জানত, কুরআন জানত, ফতোয়া দিতে পারত। অথচ তারা দাঁড়িয়েছিল একজন নিঃস্ব, নিরস্ত্র শহীদের বিরুদ্ধে, যিনি ছিলেন নবীজীর দৌহিত্র, সত্যের প্রতীক।
তারা পদ-পদবির লোভে, ক্ষমতার ভয়ে, কিংবা অন্ধ আনুগত্যে সত্যকে হত্যা করেছিল। এটাই ছিল আত্মিক ইসলামের প্রথম শাহাদত।
উমাইয়া, আব্বাসি, ফাতেমীয়, ওসমানি, মুঘল—সব খিলাফতের যুগে ইসলাম ছিল রাজসভার অলংকার। ফতোয়া ছিল শাসকের অনুগামী। ইসলাম ব্যবহার করা হতো যুদ্ধ, কর আদায়, এবং প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে।
এই সময়ে জন্ম নেয় আরেকটি নীরব ধারা—সুফিবাদ। যেখানে ইসলাম ফিরল হৃদয়ের ভিতরে, অন্তরের দরবেশের ভাষায় সুফিরা বললেন:
“রাজনীতি আল্লাহর পথে নয়, প্রেমের মাধ্যমে পৌঁছো হৃদয়ের দরজায়।”
কিন্তু সেই প্রেমনির্ভর ইসলাম বারবার রাষ্ট্র ও ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছে।
বিশ্বযুদ্ধের পর সৌদি রাজতন্ত্র যখন ক্ষমতায় আসে, তারা ইসলামের নতুন সংস্করণ তৈরি করে—ওহাবি-সালাফি মতবাদ।
এটা ছিল:
১) শিরক ও বিদআতের নামে হৃদয়ের ইসলাম ধ্বংসের চেষ্টা,
২) কাবা ও হজ্বকে রাজস্বের উৎসে পরিণত করা,
৩) ইসলামকে আমেরিকার রাজনীতির ছায়া বানিয়ে রাখা।
আজ হজ্বের টাকা যায় আমেরিকার অস্ত্র কেনায়, সুন্নি-মুসলমানদের দিয়ে যুদ্ধ করানো হয় শিয়া-মুসলমানদের বিরুদ্ধে, আর কুরআন মুখস্থ হয়—কিন্তু হৃদয়ে ঢোকে না।
আজ শিশুরা কুরআন মুখস্থ করে, অর্থ বোঝে না। মাদ্রাসা থেকে বের হয় ফতোয়াবাজ, প্রেমবিমুখ বক্তা। ইসলামি বক্তৃতা আজ এক ব্যবসা—যেখানে দরকার বড় মঞ্চ, ক্যামেরা, স্পন্সর।
হৃদয়ের দীনের বদলে তৈরি হয়েছে শব্দের ইসলাম।
আমরা এখন দ্বীনের নামে লড়ি—কিন্তু দীনকে বাঁচাই না। আমরা সুন্নি, শিয়া, দেওবন্দি, আহলে হাদিস, সালাফি—সব পরিচয় লালন করি, কিন্তু “মুহাম্মদী” পরিচয় হারিয়ে ফেলেছি।
আসল ইসলাম এখন কোনো রাষ্ট্রে নেই, কোনো মুফতির মুখে নেই, কোনো ফতোয়ায় নেই। আসল ইসলাম আছে কিছু দরবেশের মনে, কিছু প্রেমিকের কান্নায়, কিছু একাকী যাত্রার আলোর রেখায়। আমরা যদি সত্যিই রাসূলের ইসলাম খুঁজি, তবে সেটি খুঁজে পাব—
• ভাঙা মসজিদের নিঃশব্দ দরজায়,
• প্রেমিক সুফির অন্তর্জগতে,
• কারবালার বালুকায় রক্তাক্ত এক শহীদের দু’আয়।
তুমি কার দলে ?
হোসাইনের ?
না কি ইয়াজিদের.?


