ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপের মুখে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিনিয়োগে গভীর স্থবিরতা। বেসরকারি ও বিদেশি—উভয় ধরনের বিনিয়োগই সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত প্রভাবে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সতর্ক করেছে—বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে না আনলে সংকট আরও গভীর হবে এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।
বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি: স্থবিরতার গভীরতা
সাম্প্রতিক অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি দৃশ্যমানভাবে কমেছে। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই)ও নিম্নমুখী, যা আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। উচ্চ সুদহার শিল্প ও সেবা খাতে প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি সময়ে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে স্থগিত করেছে।
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিনিয়োগ কমার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বেকারত্বের চাপ বাড়ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে—যার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিফলনও অনিবার্য।
উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন: দশকের সর্বনিম্ন গতি
চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১.৫ শতাংশ—গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি ব্যয়ের এই ধীরগতি বেসরকারি খাতের জন্য নেতিবাচক সংকেত পাঠাচ্ছে। অবকাঠামোকেন্দ্রিক ব্যয়ের আধিক্যের বিপরীতে মানবসম্পদ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তবায়নের দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ব্যাংক খাতের সংকট: বিনিয়োগের বড় প্রতিবন্ধক
সিপিডির মতে, বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম মূল কারণ ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বিনিয়োগ সহায়তা দিতে পারছে না। ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে (crowding out effect)।
মূল্যস্ফীতি ও বাজার কাঠামো: কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফা ক্ষীণ হচ্ছে। বিশ্ববাজারে চাল ও গমের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন না থাকা বাজার কাঠামোর দুর্বলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবকে স্পষ্ট করে। কেবল সুদের হার বাড়িয়ে এই কাঠামোগত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ আস্থা
নির্বাচনের আগে ও পরে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করেছে। সিপিডি জোর দিয়ে বলছে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আস্থা পুনর্গঠন—যার জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সুশাসন এবং পূর্বানুমেয় নীতিকাঠামো।
রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা: ঝুঁকি ও সংস্কার
রাজস্ব আদায়ের চাপ বাড়লেও ব্যাংকনির্ভর বাজেট ঘাটতির প্রবণতা বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। সিপিডি অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমানো, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো, অবৈধ অর্থ পাচার রোধ এবং এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখে কর সংস্কারের সুপারিশ করেছে।
নীতিগত সুপারিশ
- বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে নীতির কেন্দ্রে আনা: শিল্প, এসএমই ও রপ্তানিমুখী খাতে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা।
- ব্যাংক খাত সংস্কার অব্যাহত রাখা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন কার্যকর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি।
- মূল্যস্ফীতির কাঠামোগত সমাধান: সরবরাহব্যবস্থা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকিতে সংস্কার।
- উন্নয়ন ব্যয়ের গতি ও গুণগত মান বৃদ্ধি: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ জোরদার।
- নীতিগত ধারাবাহিকতা ও আস্থা পুনর্গঠন: নির্বাচনের পর দ্রুত স্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ—বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবির থাকলে এই সম্ভাবনা অপচয় হবে। সিপিডির বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেখায়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্রীয় নীতিগত অগ্রাধিকার না বানালে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। নতুন সরকারের জন্য এখনই সময় আস্থা, সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার।


