বিশেষ প্রতিবেদক

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী সংকটে পড়েছে প্রার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের কারণে। খেলাপি ঋণ, দ্বৈত নাগরিকত্ব ও সরকারি চাকরির তথ্য আড়াল করে মনোনয়নপত্র দাখিল করায় দলটির একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে। এর ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট আসন নয়, সামগ্রিকভাবে দলের নির্বাচনী কৌশল ও ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল।
দুটি আসনে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে। অপর একটি আসনে প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেও ফলাফল ও শপথ গ্রহণ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে।
খেলাপি ঋণে প্রার্থিতা বাতিল
কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে খেলাপি ঋণের কারণে। উচ্চ আদালতে আপিল করেও তিনি প্রার্থিতা ফিরে পাননি। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী যদি শুরুতেই তাঁর ঋণসংক্রান্ত তথ্য দলকে অবহিত করতেন, তাহলে ওই আসনে বিকল্প শক্তিশালী প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ থাকত। তথ্য গোপনের কারণে এখন সেখানে বিএনপি প্রার্থীহীন নির্বাচনের মুখে পড়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা
কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপনের অভিযোগ ওঠে। একই আসনের বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের প্রার্থী কাজী নুরে আলম সিদ্দিকী নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে ১৮ জানুয়ারি শুনানি শেষে ইসি তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করে। আপিল বিভাগে করা লিভ টু আপিলও খারিজ করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ।
তবে একই আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া হাই কোর্টের আদেশে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এ আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী হাসান আহমেদ আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করে জানান, মোবাশ্বের আলম নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ওপর তাঁর প্রার্থিতা বৈধতা নির্ভর করবে। ফলে তিনি নির্বাচনে জয়ী হলেও শপথ গ্রহণে আইনি বাধা থাকতে পারে।
একাধিক আসনে খেলাপি ঋণের অভিযোগ
বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া আরও বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধেও ব্যাংকঋণ খেলাপির তথ্য পাওয়া গেছে। যশোর-৪ (বাঘারপাড়া–অভয়নগর) আসনে মনোনয়ন পাওয়া ইঞ্জিনিয়ার তালহা শাহরিয়ার আইয়ুব (টি এস আইয়ুব) সরকারি ও বেসরকারি অন্তত চারটি ব্যাংকে প্রায় ১৩৮ কোটি টাকার ঋণখেলাপি ছিলেন। তিনি এ তথ্য দলকে গোপন করায় শেষ পর্যন্ত তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়।
গাজীপুর-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নানের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা খেলাপি ঋণের অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রথমদিকে এ তথ্য দলের কাছে গোপন করেছিলেন বলেও জানা গেছে।
এ ছাড়া ঢাকা-১ (দোহার–নবাবগঞ্জ) আসনের খন্দকার আবু আশফাক, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে প্রার্থী তালিকায় থাকা চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার আলমগীরসহ আরও কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে খেলাপি ঋণ ও দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে।
দুই ডজনের বেশি প্রার্থী নিয়ে প্রশ্ন
দলীয় সূত্র জানায়, সারা দেশে বিএনপির দুই ডজনেরও বেশি প্রার্থী মনোনয়নপত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন। গাজীপুর-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিলের অভিযোগও উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য যাচাইয়ে ঘাটতি ও প্রার্থীদের অসততার কারণে বিএনপি এবার অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে, যা নির্বাচনী মাঠে দলটির অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলছে।


