অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দুইটি বড় সংকটের মুখোমুখি—উচ্চ সুদের হার এবং বেসরকারি খাতে নিম্ন ঋণ প্রবাহ। আর এই দ্বিমুখী চাপ বিনিয়োগের গতি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এমনই চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত নভেম্বর মাসের ইকোনমিক আপডেট–এ।
সোমবার একনেক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার সামনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
ঋণ প্রবাহ: চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন
জিইডি প্রতিবেদন অনুযায়ী—
-
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.২৯%
-
এটি আগের মাসের ৬.৩৫% থেকে আরো কম
-
গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবাহ
-
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৭.২% ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক নিচে
জিইডি বলছে, বাজারে অর্থের দরকারি প্রবাহ না থাকায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। শিল্পোৎপাদন, এসএমই খাত এবং সেবা খাত—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।
উচ্চ সুদের হার: বিনিয়োগ ব্যয় আরও বেড়েছে
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে উচ্চ সুদের হার—
-
ব্যয় বাড়ায়,
-
বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ায়,
-
মুনাফার প্রত্যাশা কমিয়ে দেয়।
জিইডি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সুদহার কাঠামো উদ্যোক্তাদের জন্য নিরুৎসাহমূলক। উৎপাদন খাতে অর্থায়নের খরচ বেড়ে যাওয়ায়
-
নতুন প্রকল্পের সম্প্রসারণ বন্ধ হচ্ছে,
-
অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সংকোচন করছে,
-
বিদ্যমান শিল্পগুলোও পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধন পাচ্ছে না।
এ অবস্থায় সার্বিক ব্যবসায়িক আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিনিয়োগ–উৎপাদন–কর্মসংস্থান চক্রে বড় বাধা
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে, উচ্চ সুদ ও কম ঋণ প্রবাহের যুগপৎ প্রভাব অর্থনীতির মৌলিক চক্রকে ব্যাহত করছে—
১. উৎপাদন
কারখানাগুলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতার ব্যবহার কমছে।
২. বিনিয়োগ
নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প কমে যাচ্ছে বা পিছিয়ে যাচ্ছে।
৩. কর্মসংস্থান
উৎপাদন হ্রাসের ফলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না; কোথাও কোথাও চাকরিচ্যুতিও হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে যায়, তখন সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারে না।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
-
প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া
-
কর রাজস্ব আহরণে ঘাটতি
-
শিল্প খাতে মন্দাভাব দীর্ঘায়িত হওয়া
-
বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া
-
খেলাপি ঋণ আরও বাড়ার ঝুঁকি
এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে দ্রুত নীতি–হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
জিইডির সুপারিশ (প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা)
যদিও প্রকাশিত অংশে সরাসরি সুপারিশ উল্লেখ নেই, তবে জিইডির সাম্প্রতিক নীতিমুখ বিবেচনায় বিশ্লেষণটি কিছু সম্ভাব্য সুপারিশ তুলে ধরে—
-
সুদের হার যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে স্থিতিশীল করা
-
বেসরকারি খাতকে স্বস্তি দিতে মুদ্রানীতি নমনীয় করা
-
ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট মোকাবিলা
-
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ
-
এসএমই ও রপ্তানিমুখী খাতে সহজ শর্তে ঋণ বৃদ্ধি
জিইডির প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে দেখায় যে উচ্চ সুদহার এবং কম ঋণ প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান বাধা। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ–কর্মসংস্থান–উৎপাদন চক্র পুনরুজ্জীবিত করতে হলে ব্যাংকিং খাতে দ্রুত ও গঠনমূলক পদক্ষেপ জরুরি।
প্রতিবেদনে প্রকাশিত সূচকগুলো নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।


