সুফি সাগর সামস্

ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের এক সপ্তাহ পার হতেই জনপরিসরে ‘স্বস্তি’ শব্দটি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। বিভিন্ন মহলের বক্তব্য—রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত—এই সময়টিকে “দম বন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি” হিসেবে দেখছে। অনলাইন ও টকশো–আলোচনায়ও অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসন নিয়ে তীব্র সমালোচনা ভেসে উঠছে।
‘স্বস্তির সপ্তাহ’: কী বলছেন সাধারণ মানুষ?
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় কথা বলে জানা গেছে, অনেকে মনে করছেন—অবরোধ, হঠাৎ অভিযান ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা কমেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের শ্রমিকদের একটি অংশ বলছেন, “লেনদেন ও যাতায়াত স্বাভাবিক হওয়ায় আয়–রোজগার কিছুটা স্থিতিশীল।”
অন্যদিকে, সমালোচকরা দাবি করছেন, বিদায়ী সরকারের সময় ‘মব–রাজনীতি’, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং আর্থিক খাতে কড়াকড়ির কারণে ব্যবসা–বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে সমর্থকদের যুক্তি—দুর্নীতি দমনে কড়া অবস্থান না নিলে কাঠামোগত সংস্কার সম্ভব নয়।
এক–এগারোর সঙ্গে তুলনা: মিল–অমিল কোথায়?
অনেক বিশ্লেষক বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের তুলনা করছেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ।
উল্লেখযোগ্য মিল হিসেবে যা বলা হচ্ছে—
-
রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা গ্রহণ
-
‘রাজনৈতিক সংস্কার’–এর প্রতিশ্রুতি
-
বেসরকারি খাতে কঠোর নজরদারি ও আইনি পদক্ষেপ
-
গণমাধ্যম ও জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক
অমিলের জায়গা—
-
২০০৭–০৮ সময়কালে জরুরি অবস্থা ও সরাসরি সামরিক প্রভাব ছিল স্পষ্ট; সাম্প্রতিক সময়ে কাঠামো ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
-
অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পার্থক্য: ২০০৭–এর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সময়ের মুদ্রাস্ফীতি–চাপ এক নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তুলনা টানা গেলেও দুই সময়ের রাজনৈতিক–প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা পুরোপুরি এক ছিল না।
অভিযোগ–সমালোচনার প্রধান ক্ষেত্র
১) আইন–শৃঙ্খলা ও ‘মব’ প্রসঙ্গ
সমালোচকেরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও অনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছিল। সরকারপক্ষের বক্তব্য ছিল—দুর্নীতি ও অনিয়ম দমনে কঠোরতা প্রয়োজন।
২) বেসরকারি খাত ও ব্যাংকিং খাত
কিছু শিল্পোদ্যোক্তার অভিযোগ—তদন্ত, অ্যাকাউন্ট জব্দ ও মামলা–মোকদ্দমা ব্যবসায় অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। বিপরীতে, সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি—অর্থপাচার ও ঋণ জালিয়াতি ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
৩) গণমাধ্যম ও জনআলোচনা
একাংশের মতে, সমালোচনামূলক কণ্ঠে চাপ ছিল; অন্যরা বলেন, দুর্নীতি–বিরোধী অবস্থানকে ঘিরে তীব্র মিডিয়া বিতর্ক স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ।
জনসমর্থন থেকে অজনপ্রিয়তা: কেন এমন ধারা?
দুই সময়েই—২০০৭ ও সাম্প্রতিক—প্রথমদিকে বড় ধরনের জনসমর্থন দেখা গেলেও পরবর্তীতে অসন্তোষ বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
-
সংস্কার–প্রতিশ্রুতি দ্রুত দৃশ্যমান ফল না দিলে জনআস্থা কমে,
-
অর্থনৈতিক চাপ (মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান) সরাসরি জনজীবনে প্রভাব ফেলে,
-
রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিসর সংকুচিত হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
সামনে পথচলা: কী শেখা জরুরি?
১) সংস্কার বনাম গ্রহণযোগ্যতা – কাঠামোগত পরিবর্তন চাইলে সামাজিক–রাজনৈতিক ঐকমত্য জরুরি।
২) অর্থনৈতিক স্থিতি – বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতির ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
৩) প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য – নির্বাহী, বিচার ও গণমাধ্যমের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে আস্থাহীনতা বাড়ে।
অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই টেকসই হয়। সুশীল সমাজ নীতি–আলোচনা ও জবাবদিহিতে ভূমিকা রাখবে—তবে ক্ষমতা প্রয়োগে জনমতের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর এক সপ্তাহে জনপরিসরে যে ‘স্বস্তির’ অনুভূতি উচ্চারিত হচ্ছে, তা যেমন বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, তেমনি রাজনৈতিক আবেগেরও বহিঃপ্রকাশ। ২০০৭–এর অভিজ্ঞতা হোক বা সাম্প্রতিক সময়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শিক্ষা স্পষ্ট: সংস্কার, শাসন ও জনআস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে জনপ্রিয়তা দ্রুত ক্ষয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন—নতুন অধ্যায়ে সেই ভারসাম্য কতটা প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ পাবে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


