শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫

জাতীয় ঐক্য ব্যতীত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হয় না

পাঠক প্রিয়

ধার অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর : অর্থ উপদেষ্টা

অনলাইন ডেস্ক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ 'ভ্যাট দিবস ও ভ্যাট সপ্তাহ ২০২৫' উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ,...

সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য : ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচাই চিকলি

অনলাইন ডেস্ক ইসরায়েলের প্রবাসী ও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ “অনিবার্য” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি সিরিয়ার...

মনজুর কাদের এনসিপি থেকে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি সিরাজগঞ্জ: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী...

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ পরিকল্পনা

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন জাতীয় নির্বাচনের পর পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন। বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) তিনি সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, নোবেল...

নগদ ও যমুনা ব্যাংকের মধ্যে নতুন ফান্ড ট্রান্সফার সেবা উদ্বোধন

কর্পোরেট ডেস্ক দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক ব্যাংক যমুনা ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের সেরা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ সম্প্রতি নতুন ফান্ড ট্রান্সফার...
—    ড. সুফি সাগর সামস্
জাতীয়ভাবে দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যতীত রাষ্ট্রের শান্তি, সমৃদ্ধি, সংহতি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হয় না। যে রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর কৃষ্টির বন্ধন যত মজবুত, সেই রাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতি তত সুকঠিন। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে তাদের কৃষ্টির বন্ধন মজবুত করতে হয়। কৃষ্টির বন্ধন বিভেদ রেখাকে মুছে দেয়। এ জন্যই বাঙ্গলার উৎস ও ইতিহাস জানা দরকার। বাঙ্গলার ইতিহাস বিগত হাজার হাজার বছরের। ‘বঙ্গ’ থেকেই ‘বাঙ্গলা’ ও ‘বাঙালি জাতি’। আমাদের স্বাধীন বাঙ্গলার ভূখন্ডই হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ‘বঙ্গ’ অঞ্চল। বঙ্গ কিংবা বঙ্গের সূত্র ধরে অগ্রসর হলে বাঙ্গলার সঙ্গে এর যোগসূত্র পাওয়া যায়।
কুরআন মজিদে বর্ণিত পয়গাম্বর হযরত নুহু (আ) এর কনিষ্ট পুত্রের নাম ছিল হযরত ‘হাম’। হযরত নুহু (আ) এর আমলের মহাপ্লাবনের পর হাম ইরাক থেকে ভারতবর্ষে আগমন করেন। তাঁর ছয় পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল হিন্দু। হিন্দুর প্রথম পুত্রের নাম ছিল পুরুব, দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল বঙ্গ। এই বঙ্গ থেকেই বাঙ্গলা এবং হাজার হাজার বছর পর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশ। পুরুব হিন্দুস্থানের প্রথম রাজা হন। পুরুবের বংশে রাজা যুধিষ্ঠির জন্ম হয়। যুধিষ্ঠির চার হাজার বছর পর পৃথ্বিরায় জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু’র নামানুসারে ‘হিন্দুস্থান’ আর ভরত রায়ের নামানুসারে ‘ভারত’ এবং বঙ্গ’র নামানুসারে ‘বঙ্গ’ বা ‘বাঙ্গলা’ এবং ‘বাঙালি জাতিসত্ত্বার সৃষ্টি হয়েছে (তোয়ারিখ ফেরেস্তা)।
বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে গঠিত। ইংরেজী নেশন বাক্যটি বহুল ব্যবহৃত একটি মাত্রিক বাক্য। জনগোষ্ঠী হলো, নেশন এর অন্যতম ভিত্তি। নেশন এর সমষ্টিগত ভিত্তি হলো, জনগোষ্ঠী। জনগোষ্ঠী হলো, ‘বংশ, ভাষা, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি’ ইত্যাদির সংমিশ্রণ। নেশন থেকে ন্যাশনালিটির উৎপত্তি। ন্যাশনালিটির অর্থ হলো, ‘জাতীয়তা’। জাতীয়তা হলো, কোনো জাতির সদস্যতা। ফরাসি বিপ্লবের পর জাতীয়তার সংজ্ঞা ব্যাপকতা লাভ করেছে। ফরাসি অভিধানে নেশন বাক্যটির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘নেশন হলো এমন মানব সমাজ যা একই ভূখন্ডে বসবাস করে, যাদের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ঐক্য’। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলেছে, ‘রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ হলো, একটি জাতিগত দলবদ্ধতার চেতনা; জাতি রাষ্ট্রভিত্তিক; ধর্ম, ভাষা কিংবা অঞ্চল ভিত্তিক নয়’। জাতীয় রাষ্ট্রের আকাঙ্খিত এবং উপার্জিত চেতনাই জাতীয় চেতনা। কৃষ্টির অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে একটি হলো, ‘ভাষা’। শুধু একটি উপাদানের উপর ভিত্তি করে জাতীয়তাবাদী চেতনা হয় না। শুধুমাত্র ভাষাগত বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বাংলাদেশকে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আবর্তিত করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বলতে শুধু বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর চেতনাকে বুঝায় না। তন্মধ্যে ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চেতনাও পরোক্ষভাবে জড়িত। কোনো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যদি অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বিদ্যমান থাকে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে উভয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে যদি ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বিদ্যমান থাকে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে ভারত তাদের ওই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত রয়েছে মর্মে উপলব্ধি করতে পারে। তাদের ওই উপলব্ধি অমূলক হবে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল কিংবা কোন ব্যক্তিত্ব যদি ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ হয় তাহলে ভারত ওই শক্তি বা ব্যক্তিকে অবদমিত করতে যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে। তারা তাদের সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক শক্তির প্রতিপক্ষকে প্রচ্ছন্নভাবে সহযোগীতা করতে পারে। যাতে রাজনৈতিকভাবে তাদের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বিএনপি থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের কাছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিরাপদ নয়। দেশ রক্ষার জন্যই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে’। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে দেশের সার্বভৌমত্ব কীভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে বিএনপি থেকে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না। কিন্তু বিএনপি তো সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব নিয়ে অমূলক কথা বলতে পারে না। সত্যিই কী আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে? কিন্তু কীভাবে? আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে কোন্ রাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে? বাংলাদেশের সীমান্তে রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে মিয়ানমারের জন্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অবশিষ্ট থাকে ভারত। তাহলে কী বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে? ভারত কী মনে করে যে, বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক শক্তি ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ? অবশ্য ভারত এমন ধারণা পোষণ করতেই পারে। অর্থাৎ ভারতের কোনো অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব যদি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক চেতনাগত কারণে অরক্ষিত হয় তাহলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বও অরক্ষিত হবে। বিএনপি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে ভারত তাদের বাংলাভাষী অঞ্চলের রাজনৈতিক চেতনার বিষয়ে চিন্তামুক্ত থাকে। কারণ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার সাথে ভারতের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাশক্তির এক হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এদিক থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকে। ভারতের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বও সুরক্ষিত থাকবে। সুতরাং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দুই ধরনের জাতীয়তাবাদী চেতনা বিদ্যমান থাকলে জাতীয় ঐক্য ধ্বংস হয়ে যায়। জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভক্ত জাতি কখনো মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পাড়ে না। বিভেদ-বৈসম্য লেগেই থাকে। এই সুযোগে প্রবল প্রতিবেশী বন্ধু না হয়ে প্রভু হয়ে যায়। তখন ওই প্রভুর সমর্থন পাওয়ার জন্য জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিতে হয়। সীমান্তে নির্বিচারে পাখি শিকারের মতো গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালালে অথবা কোনো আদরের বোনকে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখলে কিংবা আটক হওয়া কোনো ভাইকে উলঙ্গ করে অমানুষিক নির্যাতন করা হলেও কিছু বলা যায় না।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি সীমান্তে ১৪ বছরের বোন ফালানিকে ভারতের বিএসএফ গুলি চালিয়ে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখেছিল। ৯ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত থেকে আটক হওয়া এক বাংলাদেশী তরুণকে বিএসএফ উলঙ্গ করে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করেছে। ওই উলঙ্গ করা নির্যাতন যখন দেখেছি তখন মনে হয়েছে বিএসএফ বাংলাদেশকে উলঙ্গ করে নির্যাতন করছে। ষোল কোটি বাংলাদেশীকে নির্যাতন করছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলেই বিএসএফ সীমান্তের ওই সব নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। বিএসএফ যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার জবাবে যদি বাংলাদেশের বিজিবি পাল্টা গুলি চালায়, তাহলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিঃসন্দেহে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। ওই হত্যা ও নির্যাতন পর্যালোচনা করলে ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে’ বিএনপির ওই কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ভাষাগত আক্ষরিক মিল ছাড়া অন্যকোন মিল নেই। এই ভাষাগত মিলও খুব বেশি দিনের নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই রাঢ় ও সূক্ষ্ম অঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গ অঞ্চলের ভাষা ও কৃষ্টির পার্থক্য ছিল। অখন্ড ভারতে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শাসনামলে তারা প্রশাসনের সুবিধার্থে রাঢ় অঞ্চলকে যুক্ত করে বাঙালি অঞ্চলের প্রশাসনিক ইউনিট গড়ে তুলেছিল। ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষা, ছোট নাগপুর ও আসাম নিয়ে একটি প্রেসিডেন্সি করা হয়েছিল। ওই সীমারেখা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল কৃত্রিম। ওতে কৃষ্টি বা প্রকৃতিগত কিছু ছিল না। ঐতিহ্যগতভাবেই দুই বাংলার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। দুই বাংলার সত্ত্বা দুই ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর কৃষ্টির সাথে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্টির কোনো মিল নেই। বাংলা সাহিত্যের আদি যুগে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠী জাতিতে বাঙালি ছিল না। তারা ছিল ভারতীয়। একমাত্র বাংলা ভাষার আক্ষরিক মিল ছাড়া দুটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অন্যকোন মিল নেই। মৌখিক বাক্য উচ্চারণ ও আক্ষরিক বাক্য সৃষ্টিতেও অনেক অমিল রয়েছে। তারা গল্পচ্ছলে বলেন, ‘আর দাদা বলবেন না, কলকাতা থেকে বড়দা এসেছিল বৌদিকে নিয়ে, বাজার থেকে আড়াইশ’ ইলিশ এনেছিলুম, আর যা খেলুম না’! এরকম বাক্য প্রয়োগে উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমায় বসবাসকারী সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীকে নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ওই চেতনা হবে, ‘স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে’। বঙ্গ পিতার সন্তান হিসেবেই বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর আদি পরিচয়। স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনাই হবে বঙ্গবাসীর স্বকীয়তার পরিচয়। নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনাই হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে দীর্ঘকালব্যাপী। সকলের চরিত্রগত বৈশিষ্ট, আচার-আচরণ, ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ইত্যাদি হলো এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার বছরের লালিত অমূল্য কৃষ্টি। তবে আমাদের কৃষ্টিতে একটি ঘাটতি ছিল। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতাও অর্জন করেছি। আমরা এখন পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রজ্জ্বলিত বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন জাতি। ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন জাতি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল। সুতরাং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের সুরক্ষার স্বার্থেই আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের জন্য ভারতের সাথে মনস্তাত্ত্বিক বিমূর্ত বৈরী সম্পর্ক জিইয়ে রাখার মধ্যে আমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই।
সাত দফা ভিত্তিক চুক্তির মধ্য দিয়ে ভারত আমাদের সাথে একাকার হয়ে থাকতে চেয়েছিল। সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে বাংলাদেশের জনগণের সাথে একাকার হয়ে থাকার ওই প্রত্যাশা ভারী সুন্দর। এ ধরনের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে দু’পক্ষেরই শুভ সম্মতি থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে যদি কোনপক্ষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনকিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তা পূরণ হয় না। বঙ্গবন্ধু সাত দফা ভিত্তিক চুক্তি বাতিল করায় ভারতের ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এককভাবে চুক্তি বাতিল হওয়ায় ভারত তা অসম্মানজনক মনে করতেই পারে। ভারতের সম্মানে আঘাত লাগতেই পারে। নিশ্চয়ই ভারত বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এমনটা আশা করেনি। কারণ নিজ সন্তানকে বাঁচাতে পিতা-মাতা যা-যা করে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত তাই করেছিল। কিন্তু সন্তান বিপদমুক্ত হয়ে অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ হবে তা হয় না। কিন্তু সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনকিছু চাপিয়ে দেয়াও যথার্থ নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান থাকবে চির অম্লান, চির অক্ষয়, চির অব্যয় বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় কোটরে।
ভারতের ওই মনোকষ্ট এবং বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক প্রভাবের মনস্তাত্ত্বিক শঙ্কাকে জিইয়ে রাখার কোনো অবকাশ নেই। ভারতের সাথে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বিন্দুমাত্র বৈরী বিষয় জিইয়ে রাখা সুখের নয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলেদেশ হলো ভারতের দেহাভ্যন্তরে অবস্থিত। বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে যেমন মানবদেহ গঠিত। তেমনি বিভিন্ন ভূঅঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। বাংলাদেশের ভূখন্ড তেমনি ভাবে ভারতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরই অংশ। মানব-দেহের কোনো একটি অঙ্গে যদি কোনো একটি ক্ষতের সৃষ্টি হয় তাহলে সর্বাঙ্গেই সে ব্যথা অনুভূত হয়। বাংলাদেশ যদি রাজনৈতিকভাবে অস্থিরতার মধ্যে আবর্তিত থাকে, সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যদি আঘাতে আঘাতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে ক্ষতবিক্ষত করতেই থাকে আর বাংলাদেশ যদি ওই অপশক্তির রাজনীতি নিষিদ্ধ করে আর ওই অপশক্তি যদি আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে বিন লাদেন কিংবা আফগানিস্তানের মোল্লা ওমরের মতো তালেবান যোদ্ধা সৃষ্টি করে, তবে তা ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্য সুখের হবে না।
১৯৮৪ সালে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তখন ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরে অবস্থিত শিখ স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে শিখ ধর্মীয় নেতা ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হন। একই বছর ৩০ অক্টোবর দু’জন শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হন। বিন লাদেনকে যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল তারাই বিন লাদেনের দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সুতরাং ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের জনগোষ্ঠীর সুখ-শান্তি চিরঞ্জিব করার লক্ষ্যে, আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার বিষয়ে ভারতীয় ওই মনস্তাত্ত্বিক শঙ্কার অবসান করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা নির্দিষ্ট করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশে পঁচাত্তরের কলঙ্কিত ঘটনা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংঘাত চলতেই থাকবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জাতীয় ঐক্য, উন্নয়ন, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত কর্তৃক অভিন্ন নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ, তিস্তা ও গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকার প্রশ্নে সংশয় থেকেই যাবে।
জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু।
রাজনীতি যার যার ‘বঙ্গবন্ধু’ সবার।

(লেখক,  মহাসচিব, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি)।

সর্বশেষ সংবাদ

ইরান অবৈধভাবে জ্বালানি পাচারকারী জাহাজ আটক করেছে

অনলাইন ডেস্ক ওমান উপসাগর, ১২ ডিসেম্বর: ইরান শুক্রবার রাতের দিকে ওমান উপসাগরের উপকূলে ৬০ লাখ লিটার ডিজেল বহনকারী একটি তেলের...

তারেক রহমান নিজ হাতে মনোনয়ন জমা দেবেন: আমীর খসরু

অনলাইন ডেস্ক চট্টগ্রাম, ১২ ডিসেম্বর: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ হাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য...

প্রবাসীদের পোস্টাল ভোট নিবন্ধন ৩ লাখ ৪০ হাজার

অনলাইন ডেস্ক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ активно ব্যবহার করছেন। শনিবার বেলা ১০টা ২৫...

রাজনৈতিক দলগুলো সহিংসতায় লিপ্ত হলে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে : বদিউল আলম মজুমদার

নিজস্ব প্রতিবেদক রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রসঙ্গে’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা...

বগুড়ায় শীতকালীন সবজির দাম কমেনি, ক্রেতাদের দুর্ভোগ চলছেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া বগুড়ার বিভিন্ন বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেড়েছে। তবে দাম কমার বদলে অনেক সবজি আগের তুলনায় আরও দামি বিক্রি হচ্ছে। শুধু সবজি নয়,...

জনপ্রিয় সংবাদ

বাঞ্ছারামপুরে পারিবারিক বিরোধে কেরির বড়ি খেয়ে নারীর আত্মহত্যা

বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সেকেরকান্দি গ্রামে পারিবারিক বিরোধের জেরে কেরির বড়ি খেয়ে আমেনা (নাম প্রকাশিত) নামে এক নারী আত্মহত্যা করেছেন। শুক্রবার দুপুরে এ...

ইরান অবৈধভাবে জ্বালানি পাচারকারী জাহাজ আটক করেছে

অনলাইন ডেস্ক ওমান উপসাগর, ১২ ডিসেম্বর: ইরান শুক্রবার রাতের দিকে ওমান উপসাগরের উপকূলে ৬০ লাখ লিটার ডিজেল বহনকারী একটি তেলের ট্যাঙ্কার আটক করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয়...

আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘জনতার দল’-এর ১২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা

অনলাইন প্রতিবেদক আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করেছে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতার দল’। সংসদীয় মনোনয়ন ও দেশব্যাপী নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনার অংশ...

বগুড়ায় শীতকালীন সবজির দাম কমেনি, ক্রেতাদের দুর্ভোগ চলছেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া বগুড়ার বিভিন্ন বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেড়েছে। তবে দাম কমার বদলে অনেক সবজি আগের তুলনায় আরও দামি বিক্রি হচ্ছে। শুধু সবজি নয়,...