নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের পশ্চিম সীমান্তে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অবৈধ অস্ত্রের কারবারিরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সীমান্তপথে বাড়ছে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জড়িতদের তালিকা করে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনী।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই জব্দ হয়েছে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪১টি গুলি ও সাড়ে ৯ কেজি বিস্ফোরক। চলতি জানুয়ারির শুরুতে শিবগঞ্জের আজমতপুর সীমান্তের একটি আমবাগান থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি ওয়ান শুটারগান। এর আগেও একাধিক দফায় পিস্তল ও গুলি জব্দ করা হয়েছে।
গত ৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাঘা উপজেলার জোতকাদিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব দুটি ওয়ান শুটারগান ও হেরোইন উদ্ধার করে। ১২ জানুয়ারি রাজশাহী নগরীর সিটিহাট এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ের পাশ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি গুলি ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ।
এর আগে গত বছরের ২৬ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী উদ্ধার করে আটটি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬টি গুলি, গানপাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক। সীমান্ত থেকে এসব অস্ত্র রাজধানীতে পাচার করা হচ্ছিল। ১৬ আগস্ট রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় একটি কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি এয়ারগান, একটি রিভলভার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বাগমারায় অভিযান চালিয়ে একটি অস্ত্রসহ দুজনকে আটক করে সেনাবাহিনী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে অন্তত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় এখনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ফাঁক দিয়েই বেশি পরিমাণ অস্ত্র ঢুকছে দেশে। সীমান্ত পাহারায় বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন দায়িত্বে থাকলেও কৌশলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে চোরাকারবারিরা। বিজিবির হাতে যেসব অস্ত্র ধরা পড়ছে, তার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি নাইন এমএম পিস্তল।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত দিয়ে এসব অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনের সময় এসব অস্ত্র সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্তবর্তী ২৭ জেলায় অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত ৭৮৭ জন লাইনম্যানের তালিকা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩৮ জন, রাজশাহীর তিনজন, জয়পুরহাটের ১৬ জন এবং নওগাঁর ১৯ জন রয়েছে। বাকিরা অন্যান্য জেলার। তাদের ওপর বিশেষ নজরদারি চলছে। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্র কারবারিদের শনাক্তে নিয়মিত তালিকা হালনাগাদ করছে বিজিবি।
রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে ভীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরিতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অস্ত্র উদ্ধার ও কারবারিদের ধরতে বিশেষ অভিযান চলছে।”
বিজিবির রাজশাহীর ১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার জানান, পদ্মা নদীতে সাতটি স্পিডবোট দিয়ে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ভোট সামনে রেখে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে সব সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনকালীন সহিংসতা ঠেকাতে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হবে এবং অস্ত্র পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


