
সাম্প্রদায়িকতা হলো, একটি মানবতাবিরোধী প্রকৃতি। সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমেই মানুষের অধিকার, ঐক্যবদ্ধ শান্তি-শৃঙ্খলার সমাজ ও রাষ্ট্র বিনষ্ট হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, নারী ধর্ষণ, নারী ও শিশু হত্যার মত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। মানুষের সুকুমার চিন্তা-চেতনা ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান থাকে। সাম্প্রদায়িকতা থেকেই জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রদায়িকতার সাথে ধর্মীয় সম্পর্ক আছে। তবে সাম্প্রদায়িকতা ও ধার্মিকতা এক জিনিস নয়। একই ধর্ম-সংস্কৃতির মধ্যে দুই প্রকৃতির সম্প্রদায় বিদ্যমান রয়েছে। একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়, অন্যটি ধার্মিক সম্প্রদায়। ধার্মিক সম্প্রদায়ের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়ের ধর্ম-বিশ্বাস আর ধার্মিক সম্প্রদায়ের ধর্ম-বিশ্বাস এক নয়। এজন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায় ও ধার্মিক সম্প্রদায়ের ক্রিয়াকর্মকে পৃথক করে দেখতে হয়। অন্যথায়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায় ও ধার্মিক সম্প্রদায়ের স্বরূপ সঠিকভাবে বোঝা যায় না।
ধার্মিক সম্প্রদায় সর্বাবস্থায় সকল সময়, সকল স্থানে মহান আল্লাহ উপস্থিত কিংবা বর্তমান আছেন আর মানুষের অন্তর হলো, আল্লাহর বাসস্থান। এই বিশ্বাস মনে স্থাপন করে যেভাবে দুগ্ধপোষ্য শিশু নিজেকে মায়ের নিরাপদ ও শান্তিময় বুকে সোপর্দ করে দেয়, সেভাবে তারা নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে সোপর্দ করে দেন। তারা ধর্মীয় আদেশ-নিষেধ নিয়মিতভাবে অনুশীলন করেন। তারা ধর্মতত্ত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করে থাকেন। সকল ধর্ম-সম্প্রদায়কে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন। অপরদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়ের আশা-আকাঙ্খা হলো, পরকালের জন্নাত ও জান্নাতের হুর। হুর হলো, চোখ ঝলসানো ভূবনমোহিত করা সুন্দরী রূপসী নারী। পরলোকে সুন্দরী হুর লাভের মধ্য দিয়ে ভোগ-বিলাস লাভ করা এবং পরকালের বেহেস্ত লাভ এবং দোজখের আজাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই তারা ধর্মানুষ্ঠান ও ধর্ম অনুশীলন করেন। পাশাপশি ইহলোকের ভোগ-বিলাস আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদ লুট-পাটের জন্য ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস করেন। এ জন্যই ধার্মিকতা আর সাম্প্রদায়িকতা সম্পূর্ণই পৃথক বিষয়। কোনো সম্প্রদায়কে তখনই সাম্প্রদায়িক বলা যায় যখন তারা নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন করেন। ধর্মের নামে হত্যা, খুন-যখম, লুট-তরাজ আর নারী ধর্ষণ করেন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং ধর্ম কিছু নয়, মুখ্য হলো, সম্প্রদায়। ধর্মতত্ত্বে দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাসী হওয়া এবং নিষ্ঠার সাথে ধর্মীয় অনুশীলন করা হলো, ধার্মিক ব্যক্তির ধর্ম।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প সুপ্ত থাকে। সুপ্ত থাকা ওই সাম্প্রদায়িকতাকে তারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন। কিন্তু ধার্মিক ব্যক্তি কিংবা ধর্মনিষ্ঠ সম্প্রদায় সাম্প্রদায়িক নয়। সাম্প্রদায়িকতা ধার্মিক সম্প্রদায়ের ধর্ম-সংস্কৃতি ও জীবন চর্চ্চায় নেই। তারা সাম্প্রদায়িকতাকে অজ্ঞতা, অধর্ম ও অসভ্যতা বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে ধার্মিক ব্যক্তির আচরণ, নিষ্ঠার সাথে ধর্ম-অনুশীলন এবং ধর্মতত্ত্বের প্রতি অবিচল বিশ্বাস হলো, ধার্মিক সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়ের ব্যক্তির কাছে মানুষ, মানুষের অধিকার ও মানবতা বলে কিছু নেই। তাদের কাছে মানুষ ও মানবতার চেয়ে নিজ সম্প্রদায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তারা তাদের সম্প্রদায়ের প্রতি অন্ধ আবেগ পোষণ করেন। আর ধার্মিক সম্প্রদায়ের ধার্মিকতা হলো, মানুষ, মানুষের অধিকার, মানবতা ও আল্লাহর প্রতি অন্ধ আনুগত্য পোষণ করা এবং আল্লাহর সাথে ভালোবাসা স্থাপন করা। আল্লাহর প্রেম-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে নিজ আত্মসত্ত্বাবিলোপ করা এবং আল্লাহর সত্ত্বায় সত্ত্ববান হওয়া। পক্ষান্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায় হলো, দুনিয়ামুখী। ধর্মের নামে, ধর্মের লেবাস পড়ে অন্যের ক্ষতিসাধন করা হলো তাদের ধর্ম। যে সম্প্রদায় ধর্মরক্ষার নামে অন্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন করেন তারাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়। এই শ্রেণির সম্প্রদায় সকল ধর্ম-সংস্কৃতির মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তবে ধর্মের সাথে সাম্প্রদায়িকতার মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই। মানবতাহীন কিছু ধর্মীয় তত্ত্ব এবং আচার-আচরণকে ভিত্তি করে যে সমাজ ও সম্প্রদায় গঠিত হয়েছে সেই সম্প্রদায়ের নিজ স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হলো, ধর্মের নামে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এ কারণে সাম্প্রদায়িকতার জন্য ধর্ম অনুশীলনে নিষ্ঠাবান হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
ভারতবর্ষে উনিশ শতকে সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ধর্মীয় ঐতিহ্যের চেতনাগত পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। এই পার্থক্য ভারতীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে এক কুৎসিৎ জটিলতা। এই জটিলতার নামই হলো, সাম্প্রদায়িকতা। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করে ইংরেজ ঔপনিবেশিক সরকার। তারা ওয়াহাবি আলেম-উলামাদের মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ওয়াহাবি আকিদার সাম্প্রদায়িক শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য থেকে মুসলমানদের পৃথক করে দেয়। আর ইউরোপীয় পন্ডিতদের উদ্ধার করা ভারতবর্ষের ঐতিহ্য ও ইতিহাস হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে তুলে দিয়ে তাদেরকে মুসলমান সম্প্রদায় থেকে পৃথক করে দেয়। শুধু তাই নয়! ইংরেজরা মুসলিম সম্প্রদায়কে স্যার, সৈয়দ, চৌধুরী, আকন, সরদার, মীর, মোল্লা, হাওলাদার, চকিদার ইত্যাদি বিভিন্ন বংশীয় উপাদিতে ভূষিত করে তাদের মানবিকতা, মানবতা ও মানবাধিকারকে ধ্বংস করে দেয়। ওই সব উপাদিতে ভূষিত বংশের সদস্যরা তাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে। তারা কোন যুক্তি কিংবা ন্যায়-অন্যায় মানতে নারাজ। তারা বংশ গৌরবে, গোষ্ঠীর লাঠির জোরে, অন্যের সম্পদ ও অধিকার কেড়ে নেয়। এখনো গ্রামে-গঞ্জে সংখ্যাগরিষ্ঠ বংশের সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে সংখ্যালঘিষ্ঠ বংশের সদস্যরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ বংশের সদস্যদের হাতেই ক্ষমতা। এখানে জ্ঞানী, গুণী. ভদ্র. শিক্ষিত ব্যক্তি কিংবা ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই, বিষয়টি কোন্ বংশের সেটাই বিবেচ্য হয়। গোষ্ঠীগত এই সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে ধর্মীয় কোনো সম্পর্ক নেই। ইংরেজ ঔপনিবেশিক সরকার তাদের শাসন ক্ষমতাকে নিরাপদ করার জন্য ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষের জাতীয় ঐক্য, মানুষের মনুষত্য ও মানবতা ধ্বংস করে দিয়েছে। মানবতাবিরোধী এই সাম্প্রদায়িকতার কারণে বিশ্বব্যাপী মানুষ মানব জাতিতে বিশ্বাসী হতে পারেনি।
ভারতবর্ষের গৌরবগাঁথা ইতিহাস হিন্দু সম্প্রদায়ের মানসকে যেভাবে আকৃষ্ট করেছিল ঠিক তার উল্টো হয়েছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের। মুসলিম সম্প্রদায় আরব-পারস্যের ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে নিজেদের ঐতিহ্য ভেবে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়েছিল। ধর্ম-প্রীতির কারণে মুঘোল সাম্রাজ্যকে তারা নিজেদের সা¤্রাজ্য বলে মনে করেছিল। মুঘোল সাম্রাজ্য এবং নবাব রাজত্বের অবসানে উচ্চ-শ্রেণির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষয়িঞ্চুতা ও হতাশা দেখা দিয়েছিল। এই হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা ওয়াহাবি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিল। ওয়াহাবি আন্দোলন মুসলিম সম্প্রদায়ের আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উন্নতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছিল। হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজ যে সময় দীক্ষিত হয়েছিল এগিয়ে চলার মন্ত্রে, পক্ষান্তরে ওয়াহাবি আন্দোলন মুসলমান সমাজকে শিখিয়েছিল পিছিয়ে থাকার মন্ত্র। ওই মন্ত্র হতে মুসলমানরা এখনো রেহাই পায়নি। এখনো তারা ওই অপশিক্ষা গ্রহণ করছে। হিন্দুরা যখন এক করে দেখল স্বদেশ ও স্বধর্মকে, মুসলিম সম্প্রদায় তখন ধর্ম-প্রীতির প্রাবল্যে পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়েছিল নিজ জন্মভূমি ভারতবর্ষকে।
উনিশ শতকে উদঘাটিত হয়েছিল ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাস ও গৌরবগাঁথা ঐতিহ্য। ইউরোপীয় পন্ডিতরা এই ইতিহাস উদঘাটন করেছিলেন। বুদ্ধ, মহাবীর, অশোক, সমুদ্রগুপ্ত, বেদ-বেদান্ত, ষড়দর্শন, গঙ্গা, যমুনা, ভাগীরথী এসব গৌরব ও ঐতিহ্য ভারতবাসীর হৃদয়ে জাগ্রত করেছিল এক অভূতপূর্ব জাতীয় চেতনা। ভারতবর্ষের ওই ঐতিহ্য পেয়ে হিন্দু সম্প্রদায় লাভ করেছিল সাম্প্রদায়িকতার সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তি। ওই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও চেতনাগত চরিত্র বদল হয়ে যায়। হিন্দু সম্প্রদায় ভারতীয় ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে তাদের জাতীয় চেতনা ও সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি হিসেবে। পক্ষান্তরে মুসলিম সম্প্রদায় ওই চেতনাকে ইসলামবিরোধী এবং মুসলমানদের স্বার্থের পরিপন্থী মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করে। ধর্ম-প্রীতির আতিশয্যে ভারতবর্ষকে তারা স্বদেশ বলে ভাবেনি। ভারতবর্ষের বাসিন্দা হয়েও ভারতের বৃহত্তর ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে তারা নিজেদের ঐতিহ্যের সন্ধান করেছিল আরব, পারস্য ও তুরস্কে। সাম্প্রদায়িক ধর্ম-সম্প্রদায়ের প্রভাবে ভারতের হিন্দু-মুসলমান একই ঐতিহ্য ও গৌরবময় ইতিহাস গ্রহণ করতে পারেনি। ভারতবর্ষের শ্যামল সমতল বনভূমি, গিরিদরী উপত্যকা পরিত্যাগ করে মুসলিম সম্প্রদায় আরবের দুস্তর মরুভূমিকে নিজেদের ঐতিহ্য বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল। মিশর, ইরান, তুর্কির নদনদী পাহাড় খন্দকই যেন ছিল তাদের আসল ঐতিহ্য। আর এর প্রচারক ছিল ওয়াহাবি আলেম সম্প্রদায়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের কাব্য সাহিত্যকে ভারতবর্ষের সাহিত্য থেকে অধিকতর প্রাধান্য দিয়ে ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। ভারতবর্ষের ঐতিহ্যকে হিন্দুদের ঐতিহ্য বলে আখ্যায়িত করেছিল। এ ধরনের বিকৃত মনোবৃত্তির ফলে ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে বকুল, জবা ও শিউলী ফুল এবং গঙ্গা, যমুনা, ভাগীরথী হয়েছিল বিজাতীয়। অজন্তা, ইলোরা, কোনারক হয়েছিল ইসলামী সংস্কৃতির পক্ষে বিপজ্জনক। অশোক, সমুদ্রগুপ্ত, হর্ষবর্ধন ছিলেন হিন্দু সংস্কৃতির প্রচারক। মুসলিম সম্প্রদায় সম্রাট আকবরকে ভেবেছিল তাদের সম্প্রদায়ের অভিভাবক রূপে। গজনীর সুলতান মাহমুদ, বাদশাহ আলমগীর ও আওরঙ্গজেবকে মনে করেছিল ভারতবর্ষের মুসলিম ঐতিহ্যের পরিচায়ক হিসেবে। ভারতীয় মুসলমানদের সাংস্কৃতিক এই বিকৃতির কারণে তারা নিজ জন্মভূমি ভারতবর্ষে ছিল পরবাসীর মত।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


